কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম রসুল। তিনি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকার অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। সরকার বলছে আমনের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়ায় বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ; অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ^জুড়ে। মন্দা ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার মুখে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সহ-সম্পাদক সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ঘাটতি ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়াদির মধ্যেই সুখবর পাওয়া গেল যে, আমনের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়ায় বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বলা হচ্ছে এবারে গত বছরের চেয়ে ১৩ লাখ টন আমন বেশি হবে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
গোলাম রসুল : আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে যে গত বছরের তুলনায় আমন ১৩ লাখ টন বেশি হবে, এটা আমার কাছে মনে হচ্ছে ইনকনক্লুসিভ। অসম্পূর্ণ, সিদ্ধান্তে আসার মতো কিছু না। এই সেন্সে যে, আমনের হারভেস্ট শুরু হতে যাচ্ছে। আমরা এবার জানি, বাংলাদেশে এবার আমন চাষের সময় সমস্যা ছিল। বৃষ্টি ছিল না, সারের দাম, ডিজেলের দাম বাড়ল, ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানল, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও রিপোর্ট পাচ্ছি যে দেশের নর্থ-ওয়েস্টার্ন এলাকা রাজশাহী, বগুড়া, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর বেল্টে আমাদের আমন ধানটা ভালো হয়েছে। আমরা আশা করতে পারি যে ফলন আগের বছরের তুলনায় একটু বেশি হবে, কিন্তু কতটুকু বেশি হবে এটা আমার মনে হয় এখনো বলা যাবে না। কারণ আমরা এট দ্য সেইম টাইম দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের কোনো কোনো এলাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাসহ আরও কোনো কোনো এলাকায় আমন উৎপাদন কম হচ্ছে। যদিও উপকূলীয় এলাকায় আমন ধান কম চাষ হয়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এবং অন্যান্য সব কিছু মিলিয়ে যে এফেক্ট তাতে নিট প্রোডাকশন কী হবে সেটা বলার জন্য মনে হয় আরেকটু সময় লাগবে। মাত্র তো ফসল তোলা শুরু হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : এ বছর বেশ দীর্ঘ খরা ছিল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি ছিল বিদ্যুৎ সংকট। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ও আঘাত হেনেছে। সরকার বলছে সেচ ও সেচ পাম্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার সিদ্ধান্তে আমন উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আপনার মত কী?
গোলাম রসুল : এটা ঠিক যে আমাদের ইরিগেশন ও পাম্পিংয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকার চেষ্টা করছে এবং অনেক জায়গায় সেটা করেছেও। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে বিদ্যুতের বাইরেও কিন্তু বিরাট ইরিগেশন এরিয়া রয়েছে। এখনো আমাদের অধিকাংশ এলাকার ইরিগেশন হয় যে শ্যালো টিউবয়েলের মাধ্যমে, সেটা কিন্তু চলে ডিজেলে। যখন জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ে সেটা তাদের এফেক্ট করে। তারা সেচ করছে ডিজেলের মাধ্যমে, লাখ লাখ শ্যালো টিউবয়েল রয়েছে যারা বিদ্যুতের কানেকশন পায়নি। ফলে এখানে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কতটুকু ভূমিকা রেখেছে তা পরিষ্কার না।
দেশ রূপান্তর : উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে অনেক কৃষক ধান চাষ বাদ দিয়ে অন্য লাভজনক ফসল উৎপাদনের দিকেও ঝুঁকছে। এছাড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, অতিবৃষ্টি বন্যা তো রয়েছেই। প্রতি বছর দেশের কৃষিজমিও কমছে। এর মধ্যেও প্রতি বছর ধান উৎপাদন বাড়ছে, এর কারণ কী?
গোলাম রসুল : প্রতি বছর ধান উৎপাদন বাড়ছে এটা ঠিক। কিন্তু কৃষকদের ধান উৎপাদনে আগ্রহটাও কমে যাচ্ছে। আমাদের গ্রামাঞ্চলে আশি-নব্বইয়ের দশকে যে সমস্ত জমিতে রবিশস্য হতো, মসুর ডাল হতো, সেগুলোতে ইরিগেশনের ফলে ধান চাষ শুরু হলো। এতে ধানের উৎপাদন বাড়ল। আমরা যখন ইরিগেশন ফ্যাসিলিটিজ দিতে পারলাম, শ্যালো টিউবয়েল স্থাপনের একটা বিপ্লব হলো, তখন অন্যান্য ফসল যেসব জমিতে হতো, সেগুলোতে ধান চাষ বাড়ল, উৎপাদন বেশি হলো। আমাদের ধান উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে মেজর রোল প্লে করছে ইরিগেশন। দেশে ড্রাই সিজনে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চে ধান চাষ করা যেত না পানির অভাবে। ইরিগেশনের ফলে ওইসময়ও ধান চাষ করা গেল। দুই নম্বর কারণ হলো নতুন নতুন উন্নত জাতের ধানের বীজ আমরা উৎপাদন করতে পারছি। এসব উন্নত জাতের ধানের চাষের ফলে ফলন বাড়ছে। কিন্তু আমরা এখন যদি দেখি, যেসব জমিতে বহু বছর ধরে এসব উচ্চফলনশীল ধান চাষ করা হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু প্রোডাক্টিভিটি কমে যাচ্ছে। তারপর যদি লক্ষ করেন, কৃষকরা প্রতি বছরই আগের বছরের তুলনায় অধিকমাত্রায় সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করছে। যেটা একসময় একটা আনসাসটেইনেবল জায়গায় চলে যাবে। সত্তর এবং আশির দশকে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজারের ব্যবহার অনেক কম ছিল। কিন্তু এখন আমরা সাউথ এশিয়ার মধ্যে রাসায়নিক সারের ব্যবহারে টপে চলে গেছি মনে হয়। কৃষক এটা ব্যবহার করছে কারণ জমির যে উর্বরতা কমে যাচ্ছে, সেটাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য। এটা আরেকটা ফিউচার কনসার্ন।
দেশ রূপান্তর : চলতি বছর প্রতি কেজি আমন চাল উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৪১ টাকা ৫৮ পয়সা; যা গত বছরের তুলনায় ৫৮ পয়সা বেশি। চলতি আমন মৌসুমে ধানের দাম কেজিতে ১ টাকা এবং চালের দাম ২ টাকা বাড়িয়ে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। সরকার নির্ধারিত এই মূল্য কি ঠিক আছে?
গোলাম রসুল : আমার কাছে, এখন, আমি জানি না, আমাদের কৃষি ডিপার্টমেন্ট এই এসেসমেন্টটা কীভাবে করেছে। তারা হয়তো প্রোডাকশন কস্ট হিসাব করে বের করেছে...। কিন্তু আমরা যখন বিভিন্ন জায়গায় যাই, গ্রাম এলাকায় যাই, কৃষকদের সঙ্গে কথা বলি সেখানে কৃষকদের যে হিসাব তাতে এই দামে তাদের উৎপাদন খরচই কভার করে না। প্রফিট বাদ দেন, খরচই ওঠে না। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে আমরা খরচের যে হিসাবটা করি সেখানে আমরা একটা জিনিস হিসাব করি নাÑ কৃষকদের যে লেবারটা যায়, প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে কৃষকের যে শ্রমটা যায়, সেটার হিসাব আমরা করি না। আমরা কেবল খরচের হিসাব করি। এখন যে সমস্ত ফ্যামিলিতে দুই/তিনজন লোক আছেন তারা হয়তো অন্যদের জমিতে কাজ না করে নিজেদের জমিতে কাজ করছেন এবং তারা তাদের শ্রমের হিসাবটা ধরছেন না, তারা সার্ভাইব করছে। কিন্তু এটাকে আমাদের ধান-চালের প্রোডাকশনকে যদি আপনি কমার্শিয়ালি দেখেন তাহলে দেখবেন এটা তেমন লাভজনক না। বেশি লাভজনক না বলেই কিন্তু দেখবেন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধান ক্ষেতকে কেটে পুকুর বানানো হচ্ছে, মাছ চাষ করছে, অনেকে ফলমূল চাষ করছে, ধান চাষ থেকে সরে যাচ্ছে এসব কারণে। ধান চাষ যদি লাভজনক হতো, কৃষকরা তো অন্যদিকে যেত না। ধানচাষ লাভজনক না হওয়াতে লং রানে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ইস্যুতে কিন্তু রিস্ক তৈরি হচ্ছে। আমার মনে হয়, আমরা যখন ধানের দাম নির্ধারণ করি তখন কৃষককে রিজনেবল প্রফিট দিয়ে দামটা ঠিক করা উচিত। এবার এখন পর্যন্ত আমি যা শুনেছি, অলরেডি মার্কেটে ১৩০০/১৪০০ টাকা মণ ধান। এবং সরকারের যে হিসাব প্রায় ১০০০ টাকার মতো, সেটা ৩/৪০০ টাকা আরও কমে যাচ্ছে বাজারদর থেকে। এই দামে কী করে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ মজুদ করতে পারবে বুঝতে পারছি না। কৃষকরা তো মার্কেটের চেয়ে কম দামে তার ধান বিক্রি করবে না। আরেকটা পয়েন্ট যেটা আমি বলতে চাই, এই সময় আমরা যদি প্রকিউরমেন্ট প্রাইসটা একটু হাই না রাখি এবং কৃষকদের যদি আমরা এখন এই সাপোর্টটা না দিই তার নিজস্ব মজুদের জন্যÑ তাহলে তো হবে না। সরকার মজুদ করছে সরকারের রিজার্ভে রাখার জন্য, কিন্তু আমাদের দেশে যে লাখ লাখ কৃষক আছেন যারা ধান উৎপাদন করেন, তারা আর্থিক অনটনের কারণে, দেনার কারণে তারা ধানটা বিক্রি করে দিচ্ছেন কম দামে। এতে তারা লুজার হচ্ছেন। এটা যদি তারা তিন/চার মাস ধরে রাখতে পারতেন, তারা বেশি দাম পেতেন। এখন সরকার তাদের একটা ঋণ দিতে পারে কয়েক মাসের জন্য। তারা এখন যে ডিপ্রেসড সেল করছেন, কিছু টাকা থাকলে তারা এটা করতেন না। তারা ফসল ধরে রাখতে পারলে একদিকে কৃষক পর্যায়ে স্টোরেজটা বাড়ত, অন্যদিকে সরকারের ওপর চাপ কমত। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিরাট একটা উদ্যোগ হতে পারত। এখন কৃষকরা ধান উৎপাদন করে টাকার অভাবে সেটা কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন কিন্তু তিন/চার মাস পরেই তাকে সেটা বেশি দামে কিনে খেতে হবে। এই যে ডিপ্রেসড সেলিংয়ের যে ক্রাইসিস, এটাকে থামানোর জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল।
দেশ রূপান্তর : সরকার দেশের ভেতর থেকে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলেও বিদেশ থেকেও চাল আমদানি করা হবে। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
গোলাম রসুল : আমার মনে হয় এবার অন্য বছরের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। অন্য সময় হলে আমি হয়তো বলতাম এটা আমদানি করার দরকার নেই। কিন্তু এ বছর আমরা যদি গ্লোবাল মার্কেটটা দেখি, সেটা খুবই আনস্ট্যাবল। আমরা জানি না যে আগামী দুই বা তিন মাস পর মার্কেটটা কী রকম হবে। গত এক/দুই মাস একটু বেটার আছে যদিও। কিন্তু এ বছর বিভিন্ন দেশে শুনছি যে আবহাওয়ার কারণে খাদ্য উৎপাদন কম হয়েছে। শুনছি চীনে, ভারতে, ইউরোপে কম হয়েছে, আমেরিকাতেও কম হয়েছে। কাজেই এটার প্রভাব ২০২৩ সালে পড়তে পারে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি আমদানি করে সেটা ভালো।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি রুশ নৌবহরের ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলে শস্য রপ্তানি চুক্তি স্থগিত করার হুমকি দিয়েছে রাশিয়া। তো সেটা রাশিয়া করুক বা না করুক, প্রশ্ন হচ্ছে যুদ্ধাবস্থায় যে কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে যুদ্ধ-পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে কী করা উচিত?
গোলাম রসুল : রাশিয়া যদি এই চুক্তি থেকে সরে আসে বা অন্য কোনো কারণে যদি কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলো থেকে শস্য রপ্তানি ফের বন্ধ হয়ে যায় সেটা গ্লোবালি খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে। আমরা আশা করি এটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রিনিউ করা হবে। এটা স্ট্যাবল না থাকলে একদিকে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে আমদানির মাধ্যমে স্টক বাড়াতে হবে। একটা বাফার স্টক তৈরি করতে হবে।
