পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ও সেনাবাহিনীর একজন মেজর জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন। তবে ইমরানের বক্তব্য ‘ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী।
দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) গত শুক্রবার রাতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) চেয়ারম্যান (ইমরান) সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং বিশেষ করে একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিযোগ করেছেন তা একেবারেরই মেনে নেওয়া যায় না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যদি বানোয়াট অভিযোগে সেনাবাহিনীর মানসম্মান ক্ষুণœ করা হয় তাহলে যে কোনো মূল্যে সেনাবাহিনী এটি রক্ষা করবে। ইমরান খান সেনাবাহিনী ও এর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের যে আঙুল তুলেছেন সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। কাউকে ঢালাওভাবে সেনাবাহিনীর মানসম্মান ক্ষুণœ করতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী।
পাকিস্তানের আইএসপিআর তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে, তারা পাকিস্তান সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে যেন অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হয় এবং যারা কোনো প্রমাণ ছাড়া সেনাবাহিনীর মানসম্মান ক্ষুণœ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ক্রিকেটের তারকা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খান ২০১৮ সালে ভোটে জিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী সেনাবাহিনীর সমর্থন তখন তার দিকে থাকলেও কিছুদিন পর তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। সেনা সমর্থন হারানো ইমরানের বিরুদ্ধে এই বছরের শুরুতে জোট বেঁধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে দেশটির বড় দুই রাজনৈতিক দল। তাতে হেরে গত এপ্রিলে ইমরানের সরকারের পতন ঘটলে প্রধানমন্ত্রী হন মুসলিম লিগের শাহবাজ শরিফ, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই। ক্ষমতা হারানো ইমরান নতুন নির্বাচনের দাবি তুলে পাকিস্তানে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে’ লংমার্চের ডাক দেন। গত ২৯ অক্টোবর লাহোর থেকে শুরু হয় এই কর্মসূচি। রাজধানী ইসলামাবাদের পথে চার দিন পর গত বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের ওয়াজিরাবাদে সমাবেশের জন্য তৈরি হলে সেখানে হয় গুলিবর্ষণ। গুলিবিদ্ধ হন ইমরান খান তবে তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে পরে তার দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়। গুলির ঘটনায় একজন নিহতেরও খবর পাওয়া যায়। আহত হন আরও বেশ কয়েকজন।
সামরিক বাহিনীর এই বিবৃতির আগে শুক্রবারই হাসপাতাল থেকে টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরান খান অভিযোগ করেন, ‘আসন্ন বিপদ সম্পর্কে আমি আগে থেকেই জানতাম এবং তথ্য পেয়েছিলাম ওয়াজিরাবাদ এবং গুজরাটের কোনো একটি স্থানে হামলা হবে। তিনজন ব্যক্তি রানা সানাউল্লাহ, শেহবাজ শরিফ এবং সেনাবাহিনীর একজন মেজর আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। যখন তারা দেখতে পায় লংমার্চে মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল তখন এ পরিকল্পনা করে।’
ইমরান খানের ওপর হামলার একদিন পর তদন্তকারীরা সন্দেহভাজন আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করলেও এ ঘটনায় মামলা (এফআইআর) দায়ের করা নিয়ে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। মামলার অভিযোগনামা থেকে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার নাম বাদ দিতে ইমরান অস্বীকৃতি জানানোয় এ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এ অভিযোগনামায় নাম রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানায়, মামলায় সেনা কর্মকর্তার নাম রাখার জন্য অনবরতই তাগাদা দিচ্ছেন ইমরান খান। এতে দোটানায় পড়েছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী পারভেজ এলাহি। বিষয়টি নিয়ে গত শুক্রবার পাঞ্জাবের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ফয়সাল শাহকার এবং জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারাসহ প্রাদেশিক আইনমন্ত্রীও। বৈঠক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ডনকে বলেন, তাদের বৈঠকে মামলা করার জন্য সব আইনি দিক সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মামলা করতে আরও দেরি হলে প্রমাণ সুরক্ষিত রাখা এবং ইমরান খানের ওপর হামলায় জড়িতদের শাস্তি দেওয়ার সব প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে।
এদিকে ইমরানের ওপর বন্দুক হামলার জেরে পিটিআইয়ের চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে স্বাভাবিকভাবে বাড়তি মাত্রা যোগ হয়েছে। গত শুক্রবার পাকিস্তানজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ হয়, বেশি কিছু জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে ইমরানের সমর্থকরা। গতকাল শনিবারও দেশজুড়ে ‘শান্তিপূর্ণ’ বিক্ষোভের ডাক দেয় পিটিআই। শনিবার লাহোরে এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মাহমুদ কুরেশি বলেন, ‘ ইমরান খানের ওপর হামলার ঘটনায় এফআইআর দায়ের নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা এটাই ইঙ্গিত করছে কিছু কর্মকর্তার হাত হয়তো কোথাও অদৃশ্য কিছুতে বাঁধা রয়েছে।’
