ব্যাংক পর্ষদের সংস্কার চায় আইএমএফ

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২২, ০২:৫৬ এএম

দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবে বিশেষ সুবিধায় অনেকেই ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না। পর্ষদ সদস্যরা প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময় ঋণ অনুমোদন করাচ্ছেন। সমঝোতার ভিত্তিতে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। খেলাপিদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও আশঙ্কাজনক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ছে উল্লেখ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে আইএমএফ।

গতকাল মঙ্গলবার আইএমএফের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাতে এসব বিষয়ে কথা বলেন।

গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে রিজার্ভের হিসাবায়ন পদ্ধতি, সুদের হারের সীমা উঠিয়ে দেওয়া, সন্দেহজনক লেনদেন, অর্থ পাচার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, তারল্য সংকট সমাধানসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরমার্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা কিছু ইস্যুতে দ্বিমত পোষণ করে নিজেদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু ঋণের সুদের হারের সীমা নির্ধারণ, অভিন্ন বিনিময় হার, রিজার্ভ গণনা পদ্ধতি ও খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংক পর্ষদ গঠনের আইনের সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আজ বুধবার সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা গাজী তৌহিদুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেলা সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিনিধিদলও উপস্থিত থাকতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের গঠন, চেয়ারম্যান, পরিচালক, তাদের প্রভাব, ঋণ মঞ্জুরে অন্য কোনো প্রভাব যেন না থাকে তা নিশ্চিত করতে বলেছে আইএমএফ। এক কথায়, ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া ইডিএফ ফান্ডসহ যেসব অর্থ ব্যবহারযোগ্য নয়, সেগুলো বাদ দিয়ে রিজার্ভের হিসাব করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফ মনে করে, খেলাপি ঋণের সঠিক তথ্য উপস্থাপন হচ্ছে না। নীতিমালার কারণে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞাকে তারা আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছেন। তা না হলে ব্যাংকিং খাত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের সঠিক তথ্য প্রকাশের কথাও তারা বলেছেন।

আইএমএফ প্রতিনিধিদের মতে, খেলাপি ঋণের হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতেও বলেছে তারা। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকে সুশাসন ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, করোনার কারণে খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে। তবে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নেই। ফলে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

আইএমএফের শর্তের বিষয়ে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইএমএফ যে শর্তগুলো দিয়েছে এটা অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। এই শর্তগুলো না দিলেও আমাদের এগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার ছিল। আইএমএফ ঋণ না দিলেও এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করার জোর দাবি জানান তিনি।

৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে গত ২৪ জুলাই আইএমএফকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ। ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছে ২৬ অক্টোবর। গতকাল ৮ নভেম্বর পর্যন্ত অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, সিকিউরিটিজ একচেঞ্জ কমিশনসহ বেশকিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা বৈঠক করেছে। আজ দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বৈঠক করা হবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে। বৈঠকের পরেই ঋণ পাওয়ার অগ্রগতি ও সার্বিক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থনৈতিক সংকটের মুখে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বারস্থ হওয়া বাংলাদেশের জন্য এবারই প্রথম নয়। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। এ ঋণ নিয়ে এখন আইএমএফ এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে আইএমএফ বাংলাদেশকে শর্ত দিয়েছিল জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার জন্য। এজন্য সরকার এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। অতীতেও ঋণ দেওয়ার সময় ভর্তুকি তুলে নেওয়া এবং নানা ধরনের সংস্কারের শর্ত বাংলাদেশকে মানতে হয়েছিল। বাংলাদেশ প্রথমবার ঋণ নিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। আইএমএফের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঋণের জন্য সংস্থাটির কাছে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি গিয়েছে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে পাঁচবার ঋণ নিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত