বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই। তবে অবয়বে বয়সের ছাপ নেই। ফিটনেসটা দিব্যি ধরে রেখেছেন। তাই তো তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনও ফুটবলের ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছেন সবুজ গালিচায়। বলছি ওয়ালী ফয়সালের কথা। জাতীয় দলের সাবেক তারকা লেফটব্যাক আগেই জানিয়েছিলেন আসছে মৌসুম শেষে বুট জোড়া তুলে রাখার কথা। অনেক তো হলো। খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে চাইছেন কোচিং ক্যারিয়ারে থিতু হতে। তাই এএফসির বিশেষ কোচিং কোর্সও শুরু করেছেন। তবে শেষবেলায় একটা আক্ষেপ সঙ্গী হয়েছে ওয়ালীর। খুব করে চেয়েছিলেন নিজ ঘর আবাহনীর হয়ে অবসর নিতে। তবে আবাহনী যে তাকে আর ঘরের ছেলে মনে করে না! তাই সেখানে উপেক্ষিত হয়েছেন। তবে চিরশত্রু মোহামেডান ঠিকই ওয়ালীকে ঠাঁই দিয়েছে নিজ ডেরায়। দলবদলের শেষ দিনে এই অভিজ্ঞ ফুটবলারকে চুক্তিবদ্ধ করেছে সাদা-কালোরা। শত্রুপক্ষের এমন সম্মানে আপ্লুত ওয়ালীও দিয়েছেন মোহামেডানকে আসছে মৌসুমে সর্বস্ব দিয়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি।
দলবদলের আনুষ্ঠানিকতাটা আগেভাগেই সেরে ফেলেছিল মোহামেডান। আগের চেয়ে এবার তারা শক্তি বাড়িয়েছে অনেকটাই। দলটির অভিজ্ঞ কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক তো শিরোপায় চোখ রেখে দল গড়ার দাবি করেছেন। তবে একটা আক্ষেপ তাদের ছিলই। অগ্রিম টাকা নিয়েও শেষ পর্যন্ত মোহামেডানে সই করেননি এ সময়ের সেরা লেফটব্যাকদের একজন রহমত মিয়া। সময় শেষ। তাই রহমতের বিকল্পও সেভাবে খোঁজা হয়নি। এর মধ্যেই গত মৌসুমে রহমতগঞ্জে খেলা ওয়ালীর কথা জানতে পারেন কোচ মানিক। তাই শেষ দিনে তার ইচ্ছেতেই ওয়ালী পান সাদা-কালো জার্সিতে বিদায় বলার সুযোগ।
ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন বলেই ওয়ালীর চাওয়া ছিল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো প্রিয় ক্লাব আবাহনীতে ফেরার। তাই রহমতগঞ্জ ছেড়ে যান। ‘বুড়ো’ সিল দিয়ে ওয়ালীর সঙ্গে গত মৌসুমেই দীর্ঘদিনের সম্পর্কটা শেষ করে দিয়েছিল আবাহনী। তারপরও ওয়ালীর বিশ্বাস ছিল আবাহনী হয়তো তাকে দিবে বিদায় নেওয়ার সুযোগ। তবে আবাহনী সেই সম্মানটা ওয়ালীকে দেয়নি।
এর মাঝে অন্য একটি বড় বাজেটের দল ওয়ালীকে কথা দিয়েও দলবদলের আগের দিন না করে দেয়। মাঠ থেকে শেষ করার ইচ্ছেটা কী তাহলে পূরণ হবে না! এই শঙ্কাটা যখন বুকে চেপে বসেছে, তখনই ওয়ালীর পাশে দাঁড়ান মোহামেডান কোচ মানিক। শেষ দিনে ওয়ালীর হাতে তুলে দেন সাদা-কালো জার্সি। সেই সঙ্গে দেখিয়েছেন সম্ভাবনার এক অবারিত দুয়ারও, ‘ওয়ালী ঠিক আগের প্রজন্মের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার একটা সুযোগ সে প্রাপ্য। আমি তাকে বলেছি, তুমি চেষ্টা করো। যদি দলের অন্যদের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে প্রমাণ করতে পারো, তবে খেলারও সুযোগ পাবে। আর যদি না-ই পারো আমরা তোমাকে সম্মানজনক বিদায় জানাব। এরপর সুযোগ থাকলে হয়তো এখানে কোচিংও করার সুযোগ এসে যেতে পারে।’
২০০৩ সালে শীর্ষ ফুটবলে পা রাখা ওয়ালীর মোহামেডানে আসাটা প্রথম নয়। ২০১০ সালে একবার সাদা-কালো জার্সিতে দেখা গেছে তাকে। তবে ২০০১ সালে ওয়ারি ক্লাবের হয়ে শীর্ষ লিগে অভিষেক হওয়া ওয়ালীর সোনালি সময়টাই কেটেছে আবাহনীতে। ২০০৩ থেকে ২০০৯ প্রথম প্রস্থে টানা সাত বছর খেলার পর ২০১০ সালে মোহামেডান আসেন। তবে পরের বছরই শেখ জামালে গিয়ে দলকে লিগ শিরোপা এনে দেন। দুই মৌসুম শেষে দ্বিতীয় প্রস্থে ফিরেছিলেন আবাহনীতে। এরপর ২০১৪ মৌসুমটা শেখ রাসেলে কাটিয়ে তৃতীয়বারের মতো আবাহনীতে এসে খেলেছেন ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত। সব মিলিয়ে ২১ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ১৫ বছরই কেটেছে ধানম-ির ক্লাবটিতে। তবে ওয়ালীর অবদান বেমালুম ভুলে গেছে আবাহনী। যেটা বড় ধাক্কা ওয়ালীর জন্য, ‘শেষবেলায় এভাবে না শুনতে হবে কল্পনাও করিনি। খুব ইচ্ছে ছিল আকাশি-হলুদ জার্সিতে অবসর নেওয়ার। সে সুযোগটা ক্লাব আমাকে দেয়নি।’ একই সঙ্গে মোহামেডানের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার ‘তবে মোহামেডানের কাছে আমি চিরঋণী হয়ে গেলাম। এতদিন বলতাম আবাহনী-মোহামেডান লড়াই। এখন থেকে বলব মোহামেডান-আবাহনী লড়াই। আবাহনীর অবজ্ঞাই আমাকে বাধ্য করছে এটা বলতে।’
