ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কার্যকর মাধ্যম

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২, ১২:৫৬ এএম

বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কাটানোর অন্যতম সহজ উপায় হচ্ছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ানো। বৈধ উপায়ে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ করার পাশাপাশি সুবিধাভোগীর কাছেও তা নিরাপদে, তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্লাটফর্মই হতে পারে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম।

গতকাল বুধবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত সেমিনারে এমন অভিমত তুলে ধরেন বক্তারা। রাজধানীর পুরানা পল্টনে সংগঠনটির কার্যালয়ে ‘বৈধ পথে সহজে নিরাপদে ডিজিটাল মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এতে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা নানা সুপারিশ তুলে ধরেন। 

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ যারা রেমিট্যান্স গ্রহণ করেন, তাদের ব্যাংকে গিয়ে লেনদেনের বিষয়ে এক ধরনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব আছে। ফলে ঘরে বসেই অবৈধ পথে রেমিট্যান্স গ্রহণ করাকেও তারা অপেক্ষাকৃত সহজ মনে করেন। বৈধপথে রেমিট্যান্স আনতে যারা কাজ করছেন তাদের সঙ্গে প্রবাসীদের দূরত্ব কমাতে না পারলে রেমিট্যান্স বাড়ানো যাবে না। এজন্য সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশের সঙ্গে সপ্তাহে তিন দিন লেনদেন বন্ধ থাকছে। এ কারণে হুন্ডিতে লেনদেনের পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। সরকার এসব প্রথা ভেঙে একটা প্রবণতা চালু করতে চায়। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। দেশের উন্নতির জন্য বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্যালেন্ডার করা বিষয়েও জোর দেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, রেমিট্যান্সের বিপরীতের বর্তমানে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আজ দেশের বাইরে গেলে কাল অনেকেই পাঁচ লাখ-দশ লাখ টাকা পাঠাচ্ছেন। কীভাবে দেশের বাইরে গিয়ে পরদিন বা সপ্তাহ না পেরুতেই এত টাকা পাঠাচ্ছেন তা খতিয়ে দেখা দরকার। হুন্ডিওয়ালা শুধু এখানে থেকে টাকা বিদেশে পাঠান না; বরং ওখান থেকেও পাঠান। যার মাধ্যমে তারা আড়াই শতাংশ প্রণোদনার সুবিধা নিচ্ছেন। এ কারণে প্রবাসী আয়ের বিপরীতে সব ক্ষেত্রে আমি আড়াই শতাংশ প্রণোদনার পক্ষে না।

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা প্রতি মাসেই এক, দুই বিলিয়ন করে রিজার্ভ হারাচ্ছি। এর মানে আমরা বাজারে ডলার ছাড়ছি। এতে রিজার্ভ কমছে। এখানে আমাদের সমন্বয়ের জন্য রপ্তানি বাড়াতে হবে এবং আমদানিনির্ভরতা থেকে সরে আসতে হবে। আমাদের দেখতে হবে কেন আমেরিকা থেকে বৈধ পথে বেশি রেমিট্যান্স আসছে, কেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে কম আসছে। লোকালি প্রবাসীদের কাছে যেতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে। মার্কেটগুলোতে আমাদের প্রচার করতে হবে যেন প্রবাসীরা শুধু  ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠান। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শুধু ফরমাল মার্কেটে ডলার সহায়তা দিলে চলবে না। এ সংকট কাটাতে হলে কার্ব মার্কেটগুলোতেও কিছু ডলার দিতে হবে। এছাড়া আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে হলে ‘রেমিট্যান্সকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে।’ এজন্য দেশের বাইরে প্রবাসীদের দোরগোড়ায় যেতে হবে। দূতাবাসগুলোকে তাদের কথা শুনতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে।  বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, এমএফএসে আমরা ভারত-শ্রীলঙ্কার পরে শুরু করলেও আমরা ভালো করছি। ডিজিটাল ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে আমাদের আরও উন্নতি দরকার। দুবাই থেকে রেমিট্যান্স কমেছে কেন সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আবার সেই দুবাইয়ে আবাসন খাতে আমাদের বিনিয়োগ বেড়েছে এটাও দেখতে হবে।

বিএফআইইউ’র সাবেক উপ-প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইস্কান্দার মিয়া বলেন, আমাদের দূতাবাসগুলো সাহায্যকারী না। অন্যদিকে যারা মাদক বা চোরাকারবারি তারা শক্তিশালী। চোরাইপথে ডলারের দাম বেশি দেওয়া হচ্ছে। আমরা সহজেই অবৈধভাবে আদান-প্রদান করতে পারছি। দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের খোঁজখবর নিলে এটা করতে পারত না। অনেকেই সোনা আনছে বা ডলার আনছে। কিন্তু সেসব ডলার ব্যাংকে যাচ্ছে না, তাহলে যাচ্ছে কোথায়? অবৈধ লেনদেনের বিষয়ে ব্যাংকের তদন্তকারী যখন তদন্তে যান তখন তাদের অর্থের লোভ দেখানো হয়। আবার জীবননাশের হুমকিও দেয়। জীবনের নিরাপত্তা বিষয়েও দেখতে হবে।

প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ও সানেম চেয়ারম্যান বজলুল খন্দকার। প্রবন্ধে তিনি বলেন, এমএফএসে ৫৫ দেশের মধ্যে আমরা ৪৪তম। ভারত-কেনিয়াসহ যারা এগিয়ে আছে তাদের স্কোর ৭৫ প্লাস, আমাদের ৪০ প্লাস। রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে ডিজিটাল কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ডিজিটাল শিক্ষা বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে যারা দেশের বাইরে যাচ্ছেন তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মনিরুল মওলা বলেন, আমাদের ব্যাংক শুরু হয়েছিল রেমিট্যান্স দিয়ে। আমরা রেমিট্যান্স গুরুত্ব দিয়ে আসছি। ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ যখন ছিল আমরা সেখানে ১২ বিলিয়ন ডলার জমা দিয়েছিলাম। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আমরা কাজ করেছি, সেখান থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছি।

বিকাশের শেখ মনিরুল ইসলাম বলেন, বিকাশে সরাসরি রেমিট্যান্স আসে না, ব্যাংক সেটেলমেন্টের মাধ্যমে আসে। নভেম্বরে গড়ে দেড় মিলিয়ন পরিমাণ ডলার আসছে। বিকাশে রেমিট্যান্স এলে প্রণোদনা ও তার মূল টাকার বিষয়ে আমরা এসএমএস করে পাঠিয়ে দিই সঙ্গে সঙ্গেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত