বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ (২৩) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। ফলে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ক্লু নিয়ে একধরনের অন্ধকারে রয়েছে তদন্তে নামা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের তিন দিনেও মামলা হয়নি কোনো থানায়। লাশ উদ্ধারের পর থেকে ফারদিনের ‘প্রেমিকা’ বুশরাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মতিঝিল বিভাগ হেফাজতে রেখেছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত ফারদিনের ‘প্রেমিকা’, সহপাঠীসহ অন্তত পাঁচজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ডিবি। এ ছাড়া গতকাল ডিবির একটি দল বুয়েট ক্যাম্পাসে গিয়ে দিনভর ফারদিনের সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলেছে।
অন্যদিকে ফারদিনের বান্ধবী বুশরার বাবা র্যাব হেফাজতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফারদিনের পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়া বুশরার এক চাচাতো ভাইও র্যাবের হেফাজতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। র্যাব কর্মকর্তারাও ফারদিন হত্যার ঘটনায় তার সহপাঠীদের এবং বুশরার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে গতকাল পর্যন্ত ফারদিনের হত্যাকারী বা হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনীই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারদিনের বান্ধবী বুশরার বাবা রয়েছেন র্যাবের কাছে, ফারদিনের ল্যাপটপও রয়েছে র্যাবের কাছে। অন্যদিকে ফারদিনের কথিত প্রেমিকা বুশরা ডিবির কাছে থাকায় সমন্বিতভাবে তদন্ত সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে কোনো সংস্থাই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে পারে না।’ ফারদিন হত্যার রহস্য উদঘাটনে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন এই কর্মকর্তা।
তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে গতকাল র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈনের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
ফারদিন হত্যার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাজীব আল মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চারটি টিম কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। কিন্তু এখনো হত্যার কোনো ক্লু উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।’
ফারদিন নিখোঁজের পর ডিএমপির রামপুরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হলে তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর সেই তদন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারদিন নিখোঁজের জিডি হওয়ার পর আমরা তদন্তের বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ থেকে লাশ উদ্ধারের পর আমরা তদন্ত স্থগিত রেখেছি। আমাদের থানায় মামলা হলে ফের তদন্ত শুরু করব।’
তিন দিন আগে মরদেহ উদ্ধার হয় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে। থানাটির ওসি মশিউর রহমান গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো থানায় কেউ মামলা করতে আসেনি। আমরা মামলা নেওয়ায় জন্য প্রস্তুত আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘লাশ আমাদের থানা এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়ায় এখানে মামলা হতে পারে, আবার ডিএমপির রামপুরা থানায় নিখোঁজের জিডি হওয়ায় সেখানেও মামলা হতে পারে।’
মামলার বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, কোন থানায় মামলা হবে, তা নির্ধারণ করবে পুলিশ সদর দপ্তর।
ফারদিন হত্যার সম্ভাব্য তিনটি কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ডিবির তদন্ত কর্মকর্তারা। সেগুলো হলো- প্রেমঘটিত বিরোধ, বুয়েটের কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বিরোধ থেকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না এবং ছিনতাইকারী বা অজ্ঞানপার্টির কবলে পড়েছিলেন কি না। এর মধ্যে প্রেমঘটিত বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফারদিন হত্যার ছায়া তদন্তের দায়িত্বে থাকা ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, হত্যার শিকার হওয়ার আগে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ফারদিনের অবস্থান তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিশ্চিত হওয়ার পর সেসব জায়গার সিসি (ক্লোজ সার্কিট) টিভি ফুটেজ সংগ্রহের কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি ফুটেজে নিখোঁজের দিন ৪ নভেম্বর ফারদিনকে রামপুরা এলাকায় তার বান্ধাবীর সঙ্গে দেখা গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তার বান্ধবী জানিয়েছেন, তারা একসঙ্গে ঘোরাফেরা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে রিকশায় উঠে রামপুরা যান। সেখানে পুলিশ বক্সের পাশে নেমে যান ফারদিন। যাওয়ার সময় বলেছিল, বাসায় যাবেন।
তবে রামপুরা থানায় ফারদিনের বাবার করা জিডিতে বলা হয়েছে, ‘বুয়েটের হলে যাওয়ার কথা বলে ৪ নভেম্বর দুপুরে বাসা থেকে বের হয় ফারদিন। পরদিন তার ক্লাস পরীক্ষা ছিল।’
বান্ধবী বুশরা দাবি করেছেন, ফারদিনের সঙ্গে চার বছর ধরে তার ভালো বন্ধুত্ব ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, বান্ধবীকে রিকশায় করে রামপুরা নামিয়ে দিয়ে জুরাইন এলাকায় যান ফারদিন। তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনও জুরাইন এলাকা পর্যন্ত সচল ছিল, এরপর বন্ধ হয়ে যায়। তাকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয় এবং যেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, সেখানে ভেসে গেছে এমনটাই ধারণা তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
গত সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের পেছনে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নৌ-পুলিশ ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারদিন ৪ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এ তথ্য জানিয়ে পরদিন রামপুরা থানায় জিডি করেন তার বাবা কাজী নূর উদ্দিন। লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেউলপাড়া কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা শেখ ফরহাদ জানান, ফারদিনের মাথার বিভিন্ন অংশে ও বুকে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নদী থেকে উদ্ধারের সময় ফারদিনের মরদেহে পচন ধরেছিল বলে জানান সেখানে উপস্থিত থাকা নৌ-পুলিশ সদস্যরা।
