পুলিশের লুকোচুরিতে বাড়ছে ছিনতাই

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২, ০২:৫৫ এএম

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের দিয়াবাড়ি ঘাট এলাকায় গত ২ নভেম্বর রাতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রিপন ব্যাপারী (২৮) নামে এক টেইলার্স দোকান কর্মচারী গুরুতর আহত হন। তার মাথায় ও পিঠে ছুরিকাঘাত করে ২০ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। আহত অবস্থায় মধ্যরাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন স্বজনরা। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে পরদিন রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দারুস সালাম থানায় যান মামলা করতে। মামলা নিতে চায় না পুলিশ। একপর্যায়ে সাধারণ ডায়েরি করে বাসায় ফিরতে বাধ্য হন। পরে গত শনিবার র‌্যাব ছিনতাইকারীদের আটক করে থানায় হস্তান্তর করলে মামলা নেয় পুলিশ।

রাজধানীতে বছরের পর বছর ধরে চলছে ছিনতাই নিয়ে পুলিশের এমন লুকোচুরি। ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নিয়ে জিডি নেওয়া সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলা নিলে থানা পুলিশকে ডিএমপি সদর দপ্তরে নিয়মিত আপডেট জানাতে হয়। আসামি গ্রেপ্তারে চাপ থাকে। ফলে অনেক সময় মামলা নিতে গড়িমসি করে। তবে যখন ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে কেউ খুন হন তখনই বেড়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। কিছুদিন গা-ঢাকা দেওয়ার পর ফের জোরেশোরে মাঠে নামে ছিনতাইকারীরা। পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার ছিনতাইকারীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত ও পুনর্বাসন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছিনতাই হলে মামলা নিতে হবে এমন নির্দেশই দেওয়া আছে থানার ওসিদের। তবে অনেক ভুক্তভোগী আদালতে যাওয়া ঝামেলা মনে করায় মামলা করতে চান না। এখানে দুপক্ষকেই সচেতন হতে হবে।’

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ ছিনতাইকে (এক থেকে চারজনের উপস্থিতি) আইনের ভাষায় বলা হচ্ছে দস্যুতা আর দলবদ্ধ ছিনতাইয়ের (পাঁচজনের বেশি উপস্থিতি) ঘটনাকে বলা হচ্ছে ডাকাতি। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ১১৪টি মামলা হয়েছে। ২০২১ সালে এ মামলার সংখ্যা ছিল ১৬৮ এবং ২০২০ সালে ১৯৭টি। এ ছাড়া চুরির ঘটনায় ২০২০ সালে ১ হাজার ৮৭৫টি, ২০২১ সালে ১ হাজার ৯৮৬ ও চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮০টি মামলা হয়েছে। তবে মামলার এ সংখ্যা প্রকৃত ছিনতাই, ডাকাতি ও চুরির চেয়ে অনেক কম বলে দাবি খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদেরই।

মিরপুরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়া রিপন ব্যাপারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানায় গেলে ওসি প্রথমে বলেন ঘটনাস্থল তিনি চেনেন না এবং দারুস সালাম থানা এলাকায়ও পড়ে না। আমি যখন বলি স্যার আপনার থানা এলাকাতেই, তখন ওসি স্যার একজন পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠান। এরপর নিশ্চিত হয়ে বলেন মামলা নিতে পারবেন না, জিডি করতে। আসামি গ্রেপ্তার করলে মামলা হবে।’ তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে দারুস সালাম থানার ওসি শেখ আমিনুল বাসার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিডি নেওয়ার কথা না। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ও র‌্যাব কাজ করেছে। পরে আসামি গ্রেপ্তারও হয়েছে। তাদের আদালতে চালান করা হয়েছে।’

আরেক ভুক্তভোগী আলতাফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। ‘স্যামসাং এস কিউ প্লাস’ ফোনটি ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায়ও মামলা না নিয়ে জিডি নেয় তেজগাঁও থানা পুলিশ। জিডিতে ছিনতাইয়ের কথা উল্লেখ করতে চাইলে পুলিশ জিডি নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।

রাজধারীর বিভিন্ন ছিনতাইকারীর তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, পেশাদার ছিনতাইকারী মো. সোহেলের বাসা রাজধানীর হাজারীবাগের কামারবাড়িতে। তার নামে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি, হাজারীবাগসহ বিভিন্ন থানায় ছয়টি ছিনতাই ও মাদকের মামলা রয়েছে। এসব মামলায় সে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছে। হাজারীবাগেরই আরেক বাসিন্দা পেশাদার ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারি দুলাল। তার নামেও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। কামরাঙ্গীরচর জাওলাহাটি এলাকার বাসিন্দা মো. রাব্বি ও সবুজ সাত-আটবার ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েও বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় ছাড়া পেয়ে যায়। এই সোহেল, দুলাল, রাব্বি, সবুজসহ তাদের আরও দুই সহযোগী রাসেল ও হৃদয়দের হাতেই গত ২২ অক্টোবর গভীর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি লেকপাড় এলাকায় খুন হন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন মজুমদার (৫১)। ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। এখন পর্যন্ত সোহেল, দুলাল, রাব্বি, সবুজকে গ্রেপ্তার করেছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। শাহাদত হত্যাকাণ্ডের আগে চিহ্নিত এ ছিনতাইকারী চক্রটি ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছে।

এর আগে গত ২৭ মার্চ ভোরে রাজধানীর মিরপুর শেওড়াপাড়ায় মূল সড়কে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহমেদ মাহি বুলবুল (৪১) নামে এক চিকিৎসক খুন হন। তার খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার ছিনতাইকারীরাও ওই এলাকার চিহ্নিত ছিনতাইকারী ও মাদকসেবী বলে জানায় পুলিশ।

ধানম-ি থানার ওসি মো. ইকরাম আলী মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোহেল ও দুলালের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও তারা জামিনে মুক্ত ছিল। এ ছাড়া অল্পবয়স্ক রাব্বি ও সবুজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। ফলে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আমরা অন্য ছিনতাইকারীদেরও বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠাই। কিন্তু তারা যদি জামিনে মুক্ত হয়ে ফের অপরাধে জড়ায়, সেখানে পুলিশের কী করার আছে। ছিনতাইয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের জেল। আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ শাস্তি নিশ্চিত করলে অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে।’

পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ শতাধিক ছিনতাইকারী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে ওত পেতে থাকে তারা। ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর থানার আসাদগেট এলাকার মিরপুর সড়কে প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে অস্ত্র হাতে মুখোশ পরে ছিনতাইয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফলে এখন ঘর থেকে বের হলেই আতঙ্কে থাকে রাজধানীবাসী।

গত ২৩ অক্টোবর ভোরে রাজধানীর শাহবাগ থানাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তায় ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে রওশনারা বেগম (৭০) নামে এক নারী আহত হন। ছিনতাইকারীরা ওই বৃদ্ধার মোবাইল ও টাকাসহ ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি শাহবাগ থানায়। গত ৭ অক্টোবর ভোরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী কাজলা আলোকপাড় এলাকায় মো. মোতালেব হোসেন (৪৮) নামে এক রিকশাচালককে মারধর করে তার অটোরিকশা, মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা।

ডিএমপির বিভিন্ন থানার ওসিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারাও ছিনতাইকারীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালেও কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে।

ছয় বছর ধরে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করা এক ওসি নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছিনতাইকারীদের বেশিরভাগই ভাসমান, তাদের স্থায়ী বাড়ি নেই। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানেরও কোনো ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে ছিনতাই করে টাকা কামানো সহজ হওয়ায় তারা এ পথ বেছে নিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে বাসা বদলে অন্য এলাকায় চলে যায়। মামলায় হাজিরা দিতে হয়। মামলা চালাতে তাদের টাকারও প্রয়োজন হয়। সেই টাকা জোগাড়ে এবং নিজের জীবন নির্বাহের জন্য ফের ছিনতাই-ডাকাতি শুরু করে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত