নাচোলের রানীমা

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২, ১১:৪৭ পিএম

আদিবাসী ও কৃষকদের অধিকারের জন্য যত আন্দোলন হয়েছে ভারতবর্ষে তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো তেভাগা আন্দোলন। এর পুরোভাগে ছিলেন ইলা মিত্র। কৃষক ও আদিবাসীর অধিকারের জন্য আন্দোলন করে শাসক শ্রেণির চক্ষুশূল হয়েছেন, নির্যাতন ভোগ করেছেন তবু নিজের আদর্শ থেকে একচুল নড়েননি নাচোলের এই রানীমা। লিখেছেন বাদল সামা

ইলা মিত্র (তখন তার নাম ছিল ইলা সেন) ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল এবং মা মনোরমা সেন ছিলেন গৃহিণী। তাদের আদিনিবাস ছিল তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে তারা সবাই কলকাতায় থাকতেন। তিনি ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজের ছাত্রী। এই কলেজ থেকে তিনি বিএ এবং পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলায় তুখোড় ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন। সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায়ও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনিই প্রথম বাঙালি মেয়ে যিনি ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক বাতিল হয়ে যাওয়ায় তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। খেলাধুলা ছাড়াও গান, অভিনয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।

১৯৪৫ সালে রমেন্দ্র (রমেন) মিত্রের সঙ্গে বিবাহের সূত্রে ইলা সেন হন ইলা মিত্র। জমিদার পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে অন্দরমহলে থাকার রীতি হলেও ইলা মিত্র গ্রামের মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারে শ্বশুরবাড়ির কাছেই স্থাপিত মেয়েদের জন্য একটি স্কুলের দায়িত্ব নেন। তার প্রচেষ্টায় ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সে সূত্রে ইলা সুপরিচিত হয়ে ওঠেন গ্রামবাসীর কাছে। এ সময় তিনি রমেন মিত্রের অনুপ্রেরণায় তেভাগার দাবিতে কৃষকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। এর ফলে গ্রামের কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাকে ডাকতেন ‘রানীমা’ বলে। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে নোয়াখালীর দাঙ্গাবিধ্বস্ত হাসনাবাদ এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজে নিয়োজিত হন। তার দৃঢ় পদক্ষেপ প্রশংসিত হয় নানা মহলে।

 দেশভাগ-পরবর্তী সময়েও তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং পার্টির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সে সময় ইলা মিত্র ও রমেন্দ্র মিত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের একটি গ্রামে আত্মগোপন করেন। সেখানে আদিবাসীদের তারা সংগঠিত করতে থাকেন। নাচোলের আদিবাসী সাঁওতাল কৃষকদের মধ্যেও ছিল তার তুমুল জনপ্রিয়তা। তেভাগা আন্দোলন রোধে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকরা তাকে ১ নম্বর আসামি করে ২৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। তার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন মহল সোচ্চার হয়ে ওঠে সে সময়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে চিকিৎসার প্রয়োজনে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর কলকাতায় চলে যান ইলা মিত্র। আর ফিরে আসেননি পূর্ব বাংলায়। তবে সেখানেও নিশ্চিত হয়নি রাজনৈতিক আশ্রয়। পড়তে হয় দুরবস্থার মধ্যে। পরে এমএস পাস করে কলকাতার সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে ভারতের শিক্ষা আন্দোলন ও নারী আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ছিলেন অনেক বছর।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতেও ইলা মিত্রের ছিল সক্রিয় ভূমিকা। প্রগতিশীল নারী, তুখোড় মেধাবী, খেলোয়াড়, সাহসী রাজনৈতিক কর্মী ও শিক্ষক পরিচয়ের পাশাপাশি লেখক হিসেবেও ছিলেন সুপরিচিত। অনুবাদ করেছিলেন বেশ কয়েকটি রুশ গ্রন্থ। ‘হিরোশিমার মেয়ে’ গ্রন্থটি অনুবাদের জন্য তিনি লাভ করেন ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু অ্যাওয়ার্ড’। ইলা মিত্র এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি কখনো অতীত হতে পারেন না। কখনোই ‘অতীত’ না হওয়া তেজোদ্দীপ্ত ইলা মিত্র যেন স্বমহিমায় ভাস্বর চিরকাল। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত