শহিদুল হক খান। একাধারে বিশিষ্ট সাংবাদিক, চলচ্চিত্র পরিচালক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার। মারণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করে এখন তিনি অনেকটাই সুস্থ। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। আজ তার ৭৫তম জন্মদিন। তার সঙ্গে কথা বলেছেন মাসিদ রণ
জন্মদিন...
৭৪ পেরিয়ে ৭৫-এ পা দিলাম। জীবনের এই পর্যায়ে এসে মনে হয়, জীবন খুব সহজ, আবার খুব জটিল। জীবনের শুরু কিংবা শেষ, কোনোটাতেই মানুষের হাত নেই। তারপরও আমরা নিজের মতো করে জীবনটাকে সাজাতে চাই। আজ বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আমার ৭৫তম জন্মদিনের আয়োজন রয়েছে।
পরিবার...
আমার জন্ম ১৯৪৮ সালের ১১ নভেম্বর বিক্রমপুরে। আমার পরিবারের কেউ কখনোই সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। আমার বাবা কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে গণিতে গোল্ড মেডেলধারী। তিনি চেয়েছিলেন আমি একজন নামকরা চিকিৎসক হই। কিন্তু আমি কীভাবে লেখালেখির সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম, নিজেই জানি না। আমার পরে অবশ্য এই অঙ্গনে একজন এসেছে। সে আমার খালাত ভাই, বিখ্যাত সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। আমাকে দেখেই সে লেখার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
সাংবাদিকতা...
আমি এসএসসি পাস করি ১৯৬৬ সালে। কিন্তু সাংবাদিকতা শুরু করি তারও আগে ১৯৬৩-তে। তখন ওয়েস্টিন হাইস্কুলে পড়তাম, সাজঘর নামের একটি সিনেমা পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিক জীবনে আত্মপ্রকাশ। এসএসসির পর আমি যুক্ত হই সিনেমার মাসিক পত্রিকা ‘সাতরঙ’-এ। বাংলাদেশে যখন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এলেন, আমি এই সাতরঙ পত্রিকায় তার প্রথম সাক্ষাৎকার করি। শুধু তাই নয়, আমিই প্রথম রাজ্জাক আর কবরীকে একে অন্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আব্দুল মালেক নামের এক ফটোগ্রাফার তাদের ছবি তুলেছিল। একটি ফটো ফিচার করেছিলাম। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমি নিজেই জোনাকি পত্রিকা সম্পাদনা করতাম। সেখানে নির্মলেন্দু গুণ থেকে শুরু করে অনেক বিখ্যাত লেখক সেখানে লিখতেন। আমার ভাই ইমদাদুল হক মিলন যখন দেখত আমি অফিসে আছি তখন লুকিয়ে অন্যের হাতে তার লেখা দিয়ে যেত। স্বাধীনতার পর আমি নতুন আরেকটি পত্রিকা করি। নাম ‘চরমপত্র’। ওই সময়ে তিনটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। ‘চরমপত্র’র সম্পাদক তো আমি, ‘জয় বাংলা’র সম্পাদক ছিলেন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী আর ‘গণকণ্ঠ’র সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ। এরপর আমি কাজ করি বিচিত্রায়। সর্বশেষ যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি।
মুক্তিযোদ্ধা...
আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি দুইভাবে। বিক্রমপুরে চালের ব্যবসা করতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ওই চালের বস্তায় লুকিয়ে রাখতাম। আর চাল বিক্রির টাকা দিয়ে আমার এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের আগরতলা পাঠাতাম। ওই সময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নাটক লিখেছিলাম। আমার বোন জামাই ডা. আব্দুল হামিদ সেটি মঞ্চে এনেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতেও সেই নাটক মঞ্চস্থ হয়।
চলচ্চিত্র নির্মাণ...
সাংবাদিকতার পাশাপাশিই আমি চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করি। ১৯৭৩-এ প্রথম ছবির কাজ শুরু করি। তখন বাংলাদেশে ভারতের অনেক ছবির গল্প চুরি করে সিনেমা হতো। কলকাতার প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ বসুর গল্প চুরি করে ঢাকাতে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিটি করছিলেন পূর্ণিমা সেনগুপ্তর স্বামী। আরও দুটি নকল ছবি করছিলেন আমাদের বিখ্যাত পরিচালক আমজাদ হোসেন আর বেবি ইসলাম। সেই বিষয়গুলো নিয়ে যখন বিচিত্রায় আমি লেখালেখি করি, আমার নামে মামলা করেন নায়িকা অলিভিয়ার প্রাক্তন স্বামী ও নির্মাতা এসএম শফি। তখন আমি সমরেশ বসুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম কলকাতা। তিনি সব শুনে আমাকে তার গল্প নিয়ে ছবি করার অনুমতি দিলেন দুটি শর্তে। প্রথম তার দুই স্ত্রীকে (আপন দুই বোন) ঢাকাই জামদানি উপহার দিতে হবে। আর তাকে বাংলাদেশে দাওয়াত করে কই আর ইলিশ খাওয়াতে হবে। তিনি মূলত আমার এলাকা বিক্রমপুরেরই মানুষ ছিলেন। তাই তার প্রতি আমার দাবি ছিল বেশি। তার অনুমতি পেয়ে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিটি শুরু করি। এটিই আমার প্রথম সিনেমা। এই ছবিতেই প্রথম অভিনয় করেন নায়িকা রোজিনা। জাফর ইকবালের বিপরীতে। ১৪ বছর লেগেছিল সেই ছবি মুক্তি দিতে। এরপর নির্মাণ করি মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘কলমিলতা’। অভিনয় করলেন সোহেল রানা, কবরী, বুলবুল আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, রোজিনা, সুচন্দা, গোলাম মুস্তাফা, রানী সরকার, রওশন জামিল, প্রবীর মিত্র, আরিফুল হক ও টেলি সামাদের মতো প্রখ্যাত তারকারা। এরপর ‘সুখের সন্ধানে’ নামে একটি ছবি করি।
নতুন কাজ...
মুক্তির অপেক্ষায় আছে আমার দুটি ছবি। কবি কাজী রোজির কবিতা অবলম্বনে করেছি ‘আমার পিরানের কোন মাপ নেই’। এখানেও প্রথমবারের মতো অভিনয় করেছেন কাজী রোজী, হুমায়ুন আজাদের কন্যা মৌলি আজাদ ও ব্যান্ড তারকা মাকসুদুল হক। সর্বশেষ করেছি ভাষা আন্দোলনের ওপর পূর্ণাঙ্গ ছবি ‘একজন ভাষাসৈনিকের গল্প’। সৈয়দ হাসান ইমাম অভিনয় করেছেন। সামনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘স্বাধীনতা’ নামে একটি ছবি করতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে অনুদানের জন্য ছবিটি জমা দিয়েছি। অভিনয়শিল্পী থাকবেন ববিতা, আসাদুজ্জামান নূর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, তারিক আনাম খান, ম হামিদ ও ফাল্গুনী হামিদ। ছবির বাইরে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ নামে একটি পত্রিকা বের করার জন্য কাজ করছি।
