বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ (২৩) হত্যাকাণ্ডে পরিবারের অভিযোগের তীর তার বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরার দিকে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রামপুরা থানায় গত বুধবার রাত ৩টায় ফারদিনের বাবার করা মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে বুশরাকে। এ মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকতা রামপুরা থানার পরিদর্শক মোহাম্মদ গোলাম মওলা বুশরাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। পরে ঢাকা মহানগর হাকিম মেহেদী হাসান পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজাদ রহমান রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তবে বুশরার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। মামলাটি রামপুরা থানা থেকে গতকালই ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে তার বান্ধবী বুশরাকে হেফাজতে নিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কোনো অকাট্য প্রমাণ পায়নি ডিবি। ফারদিনের বাবার করা মামলার এজাহারে বুশরার নাম থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বান্ধবী বুশরাকে রামপুরাতে রেখে যাওয়ার পর থেকে ছয়টি ফোন নম্বরে কথা বলেন ফারদিন। যার বেশিরভাগই তার বন্ধুবান্ধবের। তাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ফারদিনের বিচরণের স্থানগুলো শনাক্তের পর সেখানকার সিসি (ক্লোজ সার্কিট) টিভি ফুটেজ সংগ্রহের কাজ চলছে। তবে অনেক জায়গার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
এদিকে ফারদিন হত্যায় যারাই জড়িত থাক না কেন, তাদের খুঁজে বের করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বুয়েটের যে শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তার সবশেষ লোকেশন আমরা গাজীপুর পেয়েছিলাম। গাজীপুর থেকে পরবর্তীকালে কীভাবে লাশ শীতলক্ষ্যায় এলো এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরোপুরি তদন্ত না করে আগে তথ্য দেব, পরে এ বিষয়টি ভুল হবে, সেরকম কোনো কিছু আমরা করতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনার পেছনে যারাই জড়িত তাদের আমরা খুঁজে বের করব। খুঁজে বের করে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এটি একটি হত্যাকাণ্ড এবং সে বিষয়টি সামনে রেখে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট পেলে পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’
অন্যদিকে ফারদিন হত্যার বিষয়ে গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘রামপুরা থানায় ফারদিনের বাবার করা মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে বুশরাকে (ফারদিনের বান্ধবী)। আরও অন্যান্য অজ্ঞাত আসামি করেছেন। ইতিমধ্যে বুশরাকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তাকে এর আগেও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছি। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক, সামাজিক কোনো ঝামেলা ছিল কি না তা আমরা খোঁজ করছি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই-বাছাই চলছে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটছে আমরা এখনই বলতে পারছি না। একটু সময় লাগবে। ডিবির দুই-তিনটি টিম কাজ করছে। আরও পারিপার্শ্বিক বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।’
মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছে : রামপুরা থানায় ফারদিনের বাবা কাজী নূরউদ্দিন রানার করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ৪ নভেম্বর দুপুর ৩টায় বুয়েটে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয় ফারদিন। পরদিন ৫ নভেম্বর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরে দুপুরে মায়ের হাতে খাবার খাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু পরে জানা যায়, ফারদিন পরীক্ষা দেয়নি। তার শিক্ষক ও বন্ধুরা বারবার তার মোবাইলে কল করে বন্ধ পায়। পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকার খবর পেয়ে ৫ নভেম্বর বিকেলে পরিবারের সদস্যরা ফারদিনকে কল করে মোবাইল ফোন বন্ধ পান। তখন পুলিশের সঙ্গে কথা বলে তারা রামপুরা থানায় জিডি করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, জিডির পরিপ্রেক্ষিতে রামপুরা থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলামের জেরায় আমাতুল্লাহ বুশরা জানান, গত ৪ নভেম্বর ফারদিন বাসা থেকে বের হওয়ার পর ওইদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তার (বুশরা) সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। প্রথমে তারা দুজন ধানমণ্ডি সিটি কলেজ এলাকায় মিলিত হয়েছে। এরপর সেখান থেকে তারা দুজন নীলক্ষেত ও ধানমণ্ডি এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে। ফারদিন ও বুশরা ওইদিন বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে সাতমসজিদ রোডে ‘ইয়াম চা ডিস্ট্রিক্ট’ রেস্তোরাঁয় খাবার খেয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে। এরপর তারা দুজন রাত ১০টার দিকে রিকশায় করে রামপুরা টেলিভিশন ভবন এলাকায় আসে। এর তিন দিন পর গত ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান বাবা নূরউদ্দিন। ৪ নভেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার পর থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যেকোনো সময় রামপুরা থানা এলাকার ওই স্থানে বা অন্য কোথাও হত্যাকারীরা পরিকল্পিতভাবে ফারদিনকে হত্যা করে। ফারদিনের নিখোঁজ ও মৃত্যুতে আমাতুল্লাহ বুশরার ইন্ধন রয়েছে।
কে এই বুশরা : কিশোরগঞ্জ শহরের বয়লা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকেন বুশরার পরিবারের সদস্যরা। তার বাবা মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে সবুজ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। ২০১৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মা ইয়াসমিন গৃহিণী। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় বুশরা।
ফারদিনের সঙ্গে চার বছর আগে ফেইসবুকে পরিচয় হয় বুশরার। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিষয়ে পরামর্শ নিতে যোগাযোগ করতেন বুশরা। এভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ফোনে নিয়মিত কথা হতো। এ বিষয়টি জানত পরিবার। তবে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি করেছেন বুশরার মা ইয়াসমিন।
