খুলনার ময়ূর নদ খনন করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। লক্ষ্য ছিল নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। আবার খনন করা হচ্ছে। সঙ্গে খুদে খালও খনন করা হবে। কাজ শুরু হবে চলতি নভেম্বরে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এ কাজ হচ্ছে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায় ২০১৮ সালে।
এ প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদ ও খুদে খাল খননে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। এর আগে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ময়ূর নদ খনন করা হয়।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) দেওয়া তথ্য মতে, খুলনা নগরের পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত ময়ূর নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নগরীর ৬০ ও নগরের বাইরে রয়েছে ৪০ শতাংশ। আগে রূপসা নদীর সঙ্গে ময়ূরের সরাসরি সংযোগ ছিল। এখন জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার আলুতলা সøুইসগেটের মাধ্যমে জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রিত। সøুইসগেট বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। ফলে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ের স্রোতস্বিনী নদটি এখন গতিহীন। প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সে কারণে একটু বৃষ্টি হলেই নগরীতে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।
খুলনা শহরের ‘জলাবদ্ধতা দূর করতে ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় ময়ূর নদে থাকা বাঁধ অপসারণ করে তিনটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের জন্য সøুইসগেট নির্মাণ করা হবে।
প্রায় ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ৩৯৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর। এই প্রকল্পের আওতায় সারা বছর নদ খননের জন্য ভাসমান এক্সক্যাভেটর, কচুরি অপসারণের জন্য যন্ত্র, খালের মুখে পরিশোধন নেটসহ বিভিন্ন যন্ত্র কেনার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদ খননে কেসিসির ব্যয় হবে ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া খুদে খাল খননে ব্যয় হবে ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে নদী খননের লে-আউট এবং পূর্ব পরিমাপের কাজ চলছে। নভেম্বর মাসেই নদী খননের মূল কাজ শুরু হবে।
প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, বয়রা শ্মশান ঘাটের ৮০ মিটার উজান থেকে সাচিবুনিয়া ব্রিজের ১০০ মিটার পূর্ব পর্যন্ত ৫ হাজার ৯১০ মিটার নদ কাটা হবে। গড়ে ২ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত নদ খনন করা হবে। ময়ূর নদ বর্তমানে ৬৬ ফুট থেকে ১৪৪ ফুট পর্যন্ত চওড়া।
খুদে খালের আড়ংঘাটা কালভার্ট থেকে শুরু হয়ে শ্মশানঘাট সেতু থেকে ১০৭ মিটার দূর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার খনন করা হবে। ৬ নভেম্বর খননের লে-আউট প্রদান করেন সিটি মেয়র।
নিরালা এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ময়ূরের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর বড় একটি কারণ নগরের নালা-নর্দমা। নগরের গুরুত্বপূর্ণ ২০টির বেশি নালার মুখ ময়ূর নদের সঙ্গে যুক্ত। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত পানিপ্রবাহসহ নানা কারণে ঐতিহ্যবাহী নদ ব্যাপক দূষিত হচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কোনো নজর নেই। শুধু নামমাত্র খনন করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হচ্ছে।’
পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী কুদরত-ই-খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়ূর নদ খননের নামে শুধু টাকা তছরুফ হচ্ছে। আমাদের বারবার দাবি ছিল নদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী ময়ূর নদের সীমানা উদ্ধার করে পিলার দেওয়া। তা ছাড়া শুধু নগর সংস্থার অধীন এলাকায় থাকা নদের অংশ খনন না করে জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার আলুতলা থেকে খনন করতে হবে। তা না হলে আলুতলায় যে সøুইসগেট সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক মনজুুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫ মাস আগে কার্যাদেশ দিলেও তখন ছিল বর্ষা মৌসুম। এ জন্য কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। নভেম্বর মাসের শুরু থেকেই খননের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে লে-আউট ও খনন-পূর্ব অবস্থা পরিমাপ চলছে। চলতি মাসেই খননকাজ দৃশ্যমান হবে।
খুলনা নগরের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের বার কতটুকু মাটি কাটা হয়েছে, কেউ দেখতে পায়নি। খননকাজ দৃশ্যমান করতে নদে বাঁধ দিয়ে পানি শুকিয়ে ভেকু ও শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটা হবে। খননকাজে কোনো ড্রেজার ব্যবহার করা হবে না। নদী খননে কোনো ধরনের ফাঁকি সহ্য করা হবে না।’
