এসএমই মার্কেটের কোম্পানি ইউসুফ ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেডের শেয়ার বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। স্বল্প মূলধনী এ কোম্পানির শেয়ারের দর এক দিনে ২৬ থেকে ২ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। লভ্যাংশ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সার্কিট ব্রেকার না থাকায় এমন অস্বাভাবিক দর বাড়ানোর সুযোগ নিয়েছে কারসাজিকারকরা। তবে এদিন কোম্পানিটির মাত্র ৯টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
দীর্ঘদিন ওটিসি মার্কেটে থাকার পর গত ২৮ জুলাই এসএমই মার্কেটে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি। ওটিসিতে থাকার সময় কোম্পানিটির মৌলভিত্তিতে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে এসএমইতে তালিকাভুক্ত হয়ে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ইউসুফ ফ্লাওয়ার মিলস। কোম্পানির মুনাফায়ও উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। চলতি বছর ৩০ জুন হিসাববছর এ কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দেখিয়েছে ৫ টাকা ৫৩ পয়সা। স্বল্প মূলধনী এ কোম্পানির মাত্র ৬০ লাখ শেয়ার রয়েছে। কমসংখ্যক শেয়ারের কারণেই গতকাল রবিবার অস্বাভাবিক দর বাড়াতে পেরেছে কারসাজিকারকরা। এসএমই মার্কেটে লেনদেন চালু হওয়ার পর থেকে গতকালই এক লাফে শেয়ারটির দর ৭৫৬২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এমন দরবৃদ্ধি দেশের পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অস্বাভাবিক দর বাড়ায় কোম্পানিটির লেনদেন পরিস্থিতি নজরদারিতে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল করিম। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে অ্যারেঞ্জ ট্রেড হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যারা লেনদেন করেছেন, তাদের সবার বিও হিসাব নজরদারিতে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইউসুফ ফ্লাওয়ারের শেয়ারের এমন উল্লম্ফনের দিনে দেশের মূল পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। অধিকাংশ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে থাকার পরও বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৪৯ পয়েন্ট।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৭৬ শতাংশ শেয়ারই ফ্লোর প্রাইসে রয়েছে। এ পরিমাণ শেয়ারের দরপতনের কোনো সুযোগ নেই। তারপরও ব্যাপক দরপতন হয়েছে বাজারে। গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৪৪ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ২৫টির দর বেড়েছে। বিপরীতে ৮৭টির দর কমেছে। দর অপরিবর্তিত অবস্থায় বা ফ্লোর প্রাইসে ছিল ২৩২টি শেয়ার। এর বাইরে আরও ৪৫ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে পড়ে থাকায় ক্রেতার অভাবে সেগুলোর এক টাকারও কেনাবেচা হয়নি।
ফ্লোর প্রাইসের ওপরে থাকা শেয়ারগুলোর বেশিরভাগ শেয়ার দর হারানোয় প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৪৯ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৩০৫ পয়েন্টের নিচে নেমেছে। সূচক পতনের হার পৌনে এক শতাংশ। তবে লেনদেনের শুরুতে ১৯ পয়েন্ট বেড়ে ৬৩৭৩ পয়েন্ট ছাড়ানোর পর লেনদেন শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট আগে ৬৩০২ পয়েন্টে নেমেছিল। সে হিসাবে লেনদেনের মাঝে সূচকের পতন হয়েছিল প্রায় ৭১ পয়েন্ট।
পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গতকালের দরপতনে ফ্লোর প্রাইসে নেমে আসা শেয়ার সংখ্যা বেড়ে ২৯৬টিতে উন্নীত হয়েছে। চলতি বছর ৩১ জুলাই দরপতন রুখতে দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর ফ্লোর প্রাইসে নেমে আসা শেয়ারের এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। গতকালের দরপতনে একমি ল্যাব, রেনেটা, বিবিএস, কপারটেক, এনার্জিপ্যাক, জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট, স্কয়ার ফার্মা, ইউনিলিভার কেয়ারসহ ১৯ শেয়ার নতুন করে ফ্লোর প্রাইসে নেমেছে। এর আগে গত ৩০ অক্টোবর ২৯২টি শেয়ার ও ফান্ড ফ্লোর প্রাইসে নেমেছিল।
এখনো ৯৩টি শেয়ার ফ্লোরের ওপরে থাকলেও ফ্লোর প্রাইসের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ওপরে কেনাবেচা হচ্ছে ৩৩টি। ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে আরও ১০টি। বাকি ৫০ শেয়ার ফ্লোর থেকে ১০ শতাংশের বেশি দরে কেনাবেচা হচ্ছে এখনো। তবে এসব শেয়ারেরও ক্রেতা ক্রমে কমে আসছে। অনেকের শঙ্কা, একসময় গুটিকয়েক শেয়ার ছাড়া সবই ফ্লোরে নেমে আসবে। তখন লেনদেন একেবারে তলানিতে নামতে পারে।
এ অবস্থার কারণে শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিনই ২৫০ থেকে ৩০০ শেয়ার ক্রেতাশূন্য থাকছে না। গুটিকয়েক শেয়ারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে কিছু জুয়াড়ি চক্র শেয়ারদর বাড়াচ্ছিল। ওইসব শেয়ারে ভর করে লেনদেনও হাজার কোটি টাকাও ছাড়ায়। এখন ওই শেয়ারগুলো দর হারাতে থাকলে সূচকও কমছে। তার সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও ব্যাপকভাবে কমতে শুরু করেছে। গতকাল ডিএসইতে ৭২৪ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। অথচ গত মঙ্গলবারও এ বাজারে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল। গতকাল ৩৪৪ শেয়ারের কেনাবেচা হলেও ২০ শেয়ারের লেনদেন ছিল মোটের ৬৫ শতাংশের বেশি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নানা নেতিবাচক খবরের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক আছে এটা সত্য। প্রায়ই খবর হচ্ছে, ২০টি ব্যাংকের কাছে ডলার নেই, এলসি খোলা বন্ধ। ২০২৩ সালে মহাদুর্ভিক্ষ হবে এমন খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ ধারণা তৈরি করছে যে, আগামীতে অর্থনীতি খুব খারাপ অবস্থায় যাবে। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা ভীত হয়ে পড়ছেন।
