বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ বিপদ ডেকে আনছে ব্যাংকগুলোর জন্য। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয় নীতির কারণে খেলাপির পরিমাণ বাড়লেও ব্যাংকগুলো এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) জমা রাখতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের সরকারি-বেসরকারি আট বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে চারটি ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। নিয়মানুযায়ী প্রভিশন রাখতে হলে এসব ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
চলতি বছরের ৯ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এরমধ্যে তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) খেলাপি বেড়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা আট ব্যাংকের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি সমসংখ্যক ব্যাংক রয়েছে। এরমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, বেসিক, জনতা ও রূপালী ব্যাংক ছাড়াও বেসরকারি বাংলাদেশ কমার্স, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ন্যাশনাল ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নাম রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে সেখানে আমানতের নিরাপত্তা কম। এজন্য খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল, প্রভিশন ঘাটতি সমস্যা সমাধানে একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি সেপ্টেম্বর শেষে ৮ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, বেসিক, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের চারটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ১১ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি খাতের বাংলাদেশ কমার্স, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ন্যাশনাল ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করায় পুরো ব্যাংকিং খাতের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা।
প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে বেসিক ব্যাংকের। চলতি সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৬২ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর পরের অবস্থান অগ্রণী ব্যাংক, প্রভিশন ঘাটতি ৩ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে রূপালী ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির ঘাটতি ৩ হাজার ১৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আর জনতা ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৯৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
তবে ব্যতিক্রম রয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন অপর দুই ব্যাংক। যারা অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে সমর্থ হয়েছে। এর মধ্যে সর্ববৃহৎ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি অতিরিক্ত রয়েছে ৯১১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত রয়েছে ১ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে এ ব্যাংকটির নিরাপত্তা সঞ্চিতি অতিরিক্ত ১৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ছিল। আর সেপ্টেম্বর শেষে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি কমে এক লাখ টাকায় নেমে এসেছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে নানা সমস্যায় জর্জরিত ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতি ৭ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৩৪৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এছাড়া মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৪৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
তবে অতিরিক্ত প্রভিশন রেখে নজির স্থাপন করেছে বেসরকারি মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ব্যাংকটি এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে। এ ব্যাংকটি একাই প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা প্রভিশন রেখেছে। অতিরিক্ত প্রভিশন রাখা ব্যাংকের তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড। এই ব্যাংকটির অতিরিক্ত প্রভিশন ৫৪৪ কোটি। এছাড়া ৫০০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পেরেছে পূবালী ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। পূবালী ব্যাংক রেখেছে ৫১০ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অতিরিক্ত প্রভিশন ৫০০ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত সঞ্চিতি রাখায় সার্বিকভাবে পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি কম হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় কোন ধরনের ঋণে কতটা প্রভিশন রাখতে হবে তার নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু অনেক ব্যাংক এই নির্দেশনা মানছে না। প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলো লাভ বেশি দেখিয়ে থাকে। এর ফলে তাদের ট্যাক্সও বেশি দিতে হয়। কিছু কিছু ব্যাংক লাভ বেশি দেখানোর কারণে নিজেরাই নিজেদের ডিভিডেন্ড দেয়। এছাড়া প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। এতে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে যায়। আর আমানতকারীদের মধ্যে আমানতের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়।
প্রসঙ্গত, চলতি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে ৩ মাসে খেলাপি বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে খেলাপি ছিল ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে ৩৩ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ।
