প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইতিহাসেও বিশ্ববিদ্যালয়মাত্রই ছিল আবাসিক। অর্থাৎ সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের আবাসন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাঠ দেওয়া নয়; বরং জ্ঞানচর্চা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নিবিড় আদান-প্রদানের সুবিধার্থে এই আবাসিক ব্যবস্থা। এভাবে শ্রেণিকক্ষ, পাঠাগার, আর গবেষণাগারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন জ্ঞান বিকাশের পথ তৈরি হয়। কিন্তু সেই বাস্তবতা আজ আর নেই। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দূর করতে সচেষ্ট নয় বলেই বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলে গাদাগাদি করে থাকছে শিক্ষার্থীরা। একই কারণে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতেই তৈরি হয়েছে বহুল সমালোচিত ‘গণরুম’
সংস্কৃতি। প্রশ্ন হলো শিক্ষার্থীরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেও বছরের পর বছর যথাযথ আবাসনের সুবিধা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয় তাহলে তারা শিক্ষায় মনোনিবেশ করবে কীভাবে?
দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার ‘এক কক্ষে ২০০ ছাত্রী’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসন সংকট নিয়ে হলেও আদতে দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রায় একই দশা। আবাসিক হলের সাধারণ কক্ষগুলোতে খানিকটা স্বস্তি মিললেও গণরুমের দশা সবসময়ই করুণ। গণরুমেও তিন ফুট প্রস্থের একেকটি বিছানায় থাকতে হচ্ছে দুজনকে। দুজনের জন্য বরাদ্দ মাত্র একটি করে টেবিল-চেয়ার। প্রতিটি বিছানার মাঝে দুই ফুটের ফাঁকা স্থানে রাখা টেবিলে বা নিচে রাখতে হয় দুজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ফলে ঘুম, খাওয়া, পড়াশোনা সবই করতে হয় বিছানায়। এভাবে একটি গণরুমে দুই শতাধিক ছাত্রীকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীহলগুলোর গণরুমে। গণরুমের এসব বাসিন্দাকে ভোগান্তি পোহাতে হয় রান্না করতে গিয়েও। নিত্য বিড়ম্বনা আছে শৌচাগার নিয়েও; গড়ে ৩০ জন ছাত্রীর জন্য আছে মাত্র একটি শৌচাগার। শিক্ষার্থী, প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি ছাত্রীহলের গণরুমের বর্তমান দশা যেকোনো শরণার্থী শিবিরের চেয়েও করুণ। এসব হলের হাজারের বেশি ছাত্রীর দিন কাটছে মানবেতর অবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ৯ হাজার ৩৪৬ জন ছাত্রীর বিপরীতে সিট রয়েছে ৪ হাজার ৩৫৪টি; যা মোট আবাসনের মাত্র ৪৬ শতাংশ। পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা না থাকায় ছাত্রীদের ছয়টি আবাসিক হলেই গণরুম সৃষ্টি হয়েছে। হল প্রাধ্যক্ষরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রী নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে তারা গণরুমের সিটের জন্য বিভিন্ন অনুরোধ করেন। অনেকের অভিভাবক এসে মেয়ের নিরাপত্তার কথা বলে গণরুমে সিটের জন্য কাকুতি-মিনতি করেন। তখন বাধ্য হয়ে সিটের তুলনায় অধিক শিক্ষার্থী রাখতে হয়। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষ ও দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্রীদের গণরুমে থাকতে দেওয়া হয়। এর মধ্যে মন্নুজান হলের চারটি গণরুমে প্রায় দুই শতাধিক ছাত্রী, তাপসী রাবেয়া হলের দুটি গণরুমে ২৮০ জন, খালেদা জিয়া হলের দুটি গণরুমে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী থাকেন। এছাড়া বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের একটিমাত্র গণরুমে এ বছর ২১০ জন ছাত্রীকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, বেগম রোকেয়া হলে পাঁচটি রুমে প্রায় ২৫০ জন ছাত্রী ও রহমতুন্নেছা হলে কয়েকটি গণরুমে প্রায় ২৫০ ছাত্রী থাকেন। এই পরিস্থিতি সম্পর্কে তাপসী রাবেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ফেরদৌসী মহলের বক্তব্য বেশ স্পষ্ট। তিনি সরাসরিই বলেছেন, ছাত্রীদের জন্য হলের সংখ্যা না বাড়ালে এসব সংকট কাটবে না। অন্যদিকে, প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতি বছর যত সংখ্যক মেয়ে ভর্তি হচ্ছে তাদের সবাইকে জায়গা দেওয়ার মতো সিট ক্যাপাসিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। কারণ আগে ছাত্রীদের সংখ্যা কম থাকলেও এখন ছেলে-মেয়ে প্রায় সমান হারে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু ছেলেদের জন্য ১১টি হল থাকলেও মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত হল নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকটের এমন করুণ পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা ইউজিসি কারুরই অজানা নয়। কিন্তু আবাসন সংকট দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেই। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ৯৯ হাজার ৭২৩ জন শিক্ষার্থীর। প্রতিবেদন অনুযায়ী শতকরা ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। তুলনায় কম হলেও বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের আবাসনেরও সংকট রয়েছে। অথচ আবাসন সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কারণ শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়। শ্রেণিকক্ষের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্ত পরিসর আর মানসম্মত আবাসনের নিশ্চয়তাও সমান জরুরি। এসব জরুরি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসরও বিকশিত হবে না। আমরা আশা করব কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সব বিশ্ববিদ্যালয়ই ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসন সংকট দূর করতে সচেষ্ট হবে।
