জীবনের সাত দশকের মধ্যে প্রায় ছয় দশক ধরে গানকেই ধ্যান-জ্ঞান করেছেন জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা। গতকাল ছিল উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত শিল্পীর ৭০তম জন্মদিন। যদিও নিজেকে মন থেকে কিছুতেই ৭০ বছরের মনে করছেন না তিনি। মজা করে বললেন, আমি তো সবে ১৭! এবারের জন্মদিনটি সাদামাটাভাবেই কাটানো প্ল্যান ছিল এই শিল্পীর। বলেছিলেন, ‘এমনিতে জন্মদিনে পরিবার আর আত্মীয়স্বজন বাসায় আসে। তাদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা হয়। এবার বেশি বড় করে কিছুই করা হচ্ছে না। সব সময় বাসায় যা হয়, তাই-ই হবে। সামনের বছর ১৮ হলে বড় করে উদযাপন করব ভাবছি (হাসি)।’
কিন্তু যে শিল্পীর ভক্ত সারা দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তার জন্মদিনের মতো বিশেষ উপলক্ষ কি আর সাদামাটা থাকতে পারে! হয়েছেও তাই। গতকাল জন্মদিনের দুপুরে তাকে চ্যানেল আই-এর আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে হয়। এ সময় চ্যানেলটির পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে লাল গালিচা সংবর্ধনার মাধ্যমে তাকে স্টুডিওতে নেওয়া হয়। এ সময় তার সাফল্যগাথা নিয়ে চ্যানেল আই আয়োজিত একটি নতুন গান রুনা লায়লার প্রতি বিশেষ সম্মান জ্ঞাপন করে উপহার স্বরূপ তৈরি টিভি স্ক্রিনে পরিবেশন করা হয়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে শাইখ সিরাজও অংশ নেন। স্টুডিওতে কেক কেটে এবং রুনা লায়লার হাতে ক্রেস্ট তুলে দিয়ে বরেণ্য এ শিল্পীর জন্মদিন উদযাপন করা হয়। রুনা লায়লার জন্য গানটি করেছেন তারই চার অনুসারী এই প্রজন্মের চার শিল্পী সেরাকণ্ঠের মুকুটজয়ী কোনাল ও ঝিলিক, মেজবাহ বাপ্পী এবং তরিক মৃধা। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠের চার শিল্পীর সঙ্গে বিভিন্ন স্মরণীয় মুহূর্তের কথোপকথনে মেতে ছিলেন বরেণ্য এই শিল্পী। গত ১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার চ্যানেল আইয়ের নিজস্ব স্টুডিওতে রুনা লায়লার জন্য এ গানটির রেকর্ডিং সম্পন্ন হয়। গানটি লিখেছেন হাসনাত করিম পিন্টু, সুর করেছেন মনোয়ার হোসেন টুটুল, শব্দগ্রহণ সংমিশ্রণ আজম বাবু। গানটি চ্যানেল আইয়ের বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে উন্মুক্ত করা হবে।
জন্মদিনে অনেকে বলে থাকেন, জন্মদিন মানেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু রুনা লায়লা তা মনে করেন না। তার ভাষ্য, ‘জন্মদিন মানে আরেকটা বছর বেঁচে থাকা। সুস্থ থেকে বেঁচে থাকলাম এটাই আর কি।’ তবে একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা শেয়ার করলেন, ‘এ বছর আশাজির (আশা ভোঁসলে) জন্মদিনে ফোন করলাম। বললাম, আশা দিদি, হ্যাপি বার্থ ডে। শুনে হাসলেন। এরপর বললেন, কীসের হ্যাপি। এখন তো ওপরে ওঠার সিঁড়ি চালু হয়ে গেছে। হ্যাপি কোথা থেকে এলো, এটা নিয়ে আমরা অনেকক্ষণ হাসাহাসি করলাম। তবে আমার এখনো ওপরে ওঠার চিন্তাভাবনা মাথায় আসে না। আল্লাহর কাছে চাই যে সুস্থভাবে আরও হায়াত দিক। যাতে আরও ভালো কিছু করে যেতে পারি। সেটাই চাওয়া। এই বয়সেও গান করছি, সুর করছি, পারফরম্যান্স করছি এটা আল্লাহর অশেষ রহমত।’
সংগীতজীবনের দীর্ঘ ভ্রমণ। অনেক অর্জন। দেশ-বিদেশে নামডাক। বিষয়গুলো রুনা লায়লাকে আরও বিনয়ী করে। তিনি জীবন নিয়ে তুষ্ট। বলেন, ‘এই জীবনে যা পেয়েছি তা অনেক বেশি। এতটা আমি প্রাপ্তির যোগ্য কি না ভাবি। তাই বলতে পারি, প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রাপ্তি। পেছন ফিরে তাকালে তো এমনো মনে হয়, এই সবই কি আমার প্রাপ্তি? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দেশ-বিদেশের লাখো কোটি মানুষের যে ভালোবাসা, দোয়া, শ্রদ্ধা, আশীর্বাদ পেয়েছি-এমনটা কয়জনের ভাগ্যে জোটে। দেশ-বিদেশে সংগীতের অনুজপ্রতিমরা যে সম্মান ও ভালোবাসা দেখায়, তা বিস্ময় লাগে। এটা তো আমার ওপর সত্যিই আল্লাহর বিশেষ রহমত। মানুষের মনের মধ্যেই আছি, তারা প্রতিনিয়ত দোয়া করছে, ভালোবাসা প্রকাশ করছে অপ্রাপ্তির কোনো জায়গা নেই।’
এই শিল্পীর এখন একটাই চাওয়া, ভালো ভালো আরও কিছু গান গেয়ে যেতে চান। আরও কিছু ভালো সুর করার ইচ্ছে আছে। কিছু সুর অবশ্য করেছেন এরইমধ্যে। এবারের করা সুরে গেয়েছেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। দেশের কিংবদন্তি শিল্পীদের দিয়েও কিছু গান গাওয়ানোর ইচ্ছা তার।
