সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহার, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে বিভাগীয় সমাবেশ করছে বিএনপি। পাশাপাশি সম্প্রতি কূটনৈতিক কার্যক্রম জোরদার করেছে দলটি। বিএনপি নেতাদের দাবি সরকারের হয়রানির কারণে দেশের বাইরে গিয়ে কূটনৈতিক কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। এ কারণে যুক্তরাজ্যে বসে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রবাসী বিএনপি নেতাদের দিয়ে কূটনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আর দেশে শুধুমাত্র ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মিশন প্রধানদের সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীরা অংশ নিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনীতিকের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশিরভাগই রুটিন বৈঠক। আগামী সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বৈঠক একটু বেশি হচ্ছে। যাদের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আছে তারা অনেক সময় জানতে চান। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি।’
বিদেশে যেতে হয়রানির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি আবদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ থেকে আসতে যেমন বাধা দেওয়া হয়, তেমনি যুক্তরাজ্য থেকে কেউ দেশে গেলে বিমানবন্দরে একইভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি কেউ কেউ চিকিৎসা নিতে আসতে চাইলেও বাধা দেওয়া হয়। সরকারের এমন সব বাধার কারণে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে প্রবাসী নেতাদের মাধ্যমে কূটনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সম্প্রতি বেলজিয়ামে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পার্লামেন্টে ইইউ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির প্রবাসী নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গেলে সেখানে আমরা প্রতিবাদ জানাই। আগামী ডিসেম্বর মাসে প্রবাসী নেতারা যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে কর্মসূচি পালন করবেন।’
আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিবেশী ভারতের অবস্থানের বিষয়ে মালেক বলেন, ‘ভারত একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ। তারা নিশ্চয়ই চাইবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা হোক। তাছাড়া ভারত সরকারকেও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। অতীতে কী করেছে সে সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। আশা করি আগামী নির্বাচনে তাদের অবস্থান জনগণের পক্ষে থাকবে।
এছাড়া জাতিসংঘ, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশে^র সব দেশ বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায় বলে জানান আবদুল মালেক।
সুইডেন প্রবাসী বিএনপি নেতা ঝিন্টু আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি), জেনেভা কনভেনশন ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান পার্লামেন্টে কাজ করি। প্রায় প্রতি মাসে একবার বৈঠক করি। বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি।’
চলতি বছরের ৫ এপ্রিল বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়। এতে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় আহমেদ আলী মুকিবকে। সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে মোহাম্মদ রাশেদুল হককে। পরে ৫ আগস্ট দলটির বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বিএনপির সহ- আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদকে।
সম্প্রতি আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে নেড প্রাইসকে বাংলাদেশের সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন-বিক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। বলা হয়, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সতর্ক করেছেন সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে দলের নেত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাবে কিনা? এসব প্রশ্ন করা হয় তাকে।
প্রশ্নের উত্তরে নেড প্রাইস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে এবং এতে নাগরিকদের শক্তিশালী অংশগ্রহণ থাকবে। সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২৯ জুলাই সরকার কূটনীতিকদের মুখ বন্ধ করতে দূতাবাসগুলোতে চিঠি দিয়েছে যাতে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলেন। এই চিঠিপ্রাপ্তির পর বিদেশিরা আরও বেশি মুখ খুলেছেন। এমনকি যারা সচরাচর নীরব থাকেন তারাও হয়েছেন সরব। যেমন জাপান। ১৭ অক্টোবর ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেছেন, ‘স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক বিশ্ব বাংলাদেশের আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের কর্মকান্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বক্তৃতা কিংবা বিবৃতিতে সরকার কী বলছে, আর বাস্তবে কী করছে তা অনুসরণ করছে। এলিট ফোর্স র্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছে, অনুসরণ করছে তারা।’
২৬ অক্টোবর বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লী জাতীয় প্রেস ক্লাবে বলেন, ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা উন্নয়নের পূর্বশর্ত। তাই যেকোনো সমস্যা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা উচিত।’ গত ১৪ নভেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন ঢাকাস্থ কানাডিয়ান হাইকমিশনার লিলি নিকোলাস। বৈঠক শেষে আমীর খসরু সাংবাদিকদের বলেন, ‘কানাডা মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, জীবনের নিরাপত্তা, আইনের শাসনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন।’
গত ৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপ-সহকারী মন্ত্রী আফরিন আক্তার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের আয়োজনে এই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে আফরিন আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে এটাই আশা করে যুক্তরাষ্ট্র। সেজন্য আমরা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছি। অবাধ নির্বাচনের লক্ষ্যে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা-ইউএসএআইডি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
পরের দিন ৮ নভেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ে ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে করে বিএনপি। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকের বলেন, ‘সামনে যেহেতু নির্বাচন তো তা নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হয়েছে। কারণ নির্বাচনের বিষয়টি বন্ধুপ্রতিম সব দেশের মাথায় রয়েছে। কারণ তাদের কাছে নির্বাচনটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সবার কনসার্ন আছে।’
