কূটনীতিকদের দৌড়াদৌড়ি, সরকারের বিরক্তি

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৯ পিএম

‘কথা কম কাজ বেশি’ বৈশিষ্ট্যের দেশ জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকিও সম্প্রতি বলেই ফেলেছেন আগামীতে বাংলাদেশে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হবে না বলে আশা করেন তিনি। জানান, রাতে ভোট হয় এমন কথা তিনি জীবনেও শোনেননি। এর আগে এমন ধাঁচে কথা বলতে শোনা যায়নি তাকে। প্রসঙ্গ বা প্রশ্ন এলে বড়জোর বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় জাপান।’ এর মধ্যেই বিএনপি নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন কানাডার হাইকমিশনার লিলি নিকোলাস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিটার হাস তো শুধু কথা বা বৈঠক নয়, চলে যাচ্ছেন নানান জায়গায়।

স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন দেশের ঢাকার কয়েক কূটনীতিকের তৎপরতায় সরকার যারপরনাই বিরক্ত। একে বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখতে বাধ্য হচ্ছ সরকার। এ বিরক্তি গোপন রাখেনি সরকার। ভাসা ভাসা নয়, একবারে সোজাসাপ্টা বলা হয়েছে, ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকদের ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও রীতিনীতি’ মেনে চলতে। কূটনীতিকদের বুঝেশুনে কথা বলা এবং যেখানে-সেখানে মাখামাখি না করার তাগিদ ছিল চিঠির মধ্যে। ঢাকার সব দূতাবাস, জাতিসংঘ কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিসে এ-সংক্রান্ত অভিন্ন নোট পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু কয়েক কূটনীতিক মুখ আরও বেশি খুলছেন। মাখামাখি করছেন আরও বেশি। যারা সচরাচর দম ধরে থাকেন, না পারতে কথা বলেন না, তারাও কথার ঝাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ কাজে মার্কিনি রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বরাবরই এগিয়ে। কিছুদিন আগে, ঢাকা সফর করে যাওয়া মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী আফরিন আক্তারও সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে গেছেন। বড় ধরনের এজেন্ডা নিয়ে আসা আফরিন এ সময়টায় বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসা সুশীলসমাজের কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলে গেছেন।

আফরিনের আগে সফরে আসেন এডওয়ার্ড এম কেনেডি জুনিয়র। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। আবার বাংলাদেশ সরকার যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে তাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন। কথা বলেছেন সরকারের চরম বিরাগভাজন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। রাষ্ট্রদূত পিটার হাসকে পাশে নিয়ে ছবিও তুলেছেন ড. ইউনূসের সঙ্গে। এ ছবি আবার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ফেইসবুকে পোস্ট করেছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন চাইতে চাইতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে বিশ্বমানের গ্রহণযোগ্য ভোট দাবি করেই দমছেন না। সশরীরে চলে যাচ্ছেন এখানে-ওখানে। ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ডিমান্ড আরও বেশি । তিনি বলছেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন করে শুরু স্নায়ুযুদ্ধে বিশ্বের পুরনো অনেক হিসাব পাল্টে যাচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনা মহামারীর মধ্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বের নানা প্রান্তে নতুন মেরুকরণ। নানা ঘটনার ঘনঘটা। এবারের স্নায়ুযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা ইসলাম ধর্ম বা ধর্মীয় জঙ্গি ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের এবারের শত্রু কমিউনিস্ট চীন ও সাবেক সমাজতন্ত্রী রাশিয়া এবং এদের সমর্থক গোষ্ঠী। স্নায়ুচাপের এ সময় প্রতিযোগিতায় যে দেশ যেভাবে পারছে নিজেদের শক্তিমান করছে। অন্যকে ঘায়েল করছে। শত্রু-মিত্র পাল্টে যাচ্ছে। পুরনো ঘটনা নিচ্ছে নতুন অবয়ব। দীর্ঘদিনের ধারণাও পাল্টে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। বাংলাদেশ কেন, উগান্ডাও বাদ থাকছে না এ স্নায়ু থেকে। দেশ-দেশে এ ঘায়েল যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশও একটা ফ্যাক্টর। এ ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা বাংলাদেশের। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশকে নিয়ে পরাশক্তিগুলোর অনেক ইকুয়েশন। তাদের কারও কারও কাছে বাংলাদেশ একটি অমূল্য রতন।

বিশ্বরাজনীতির অন্যতম শক্তি চীন ও আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য বাংলাদেশকে আলোচনায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাদের কাছে বাংলাদেশ এখন শুধু ভারতবেষ্টিত এবং ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অবস্থিত ক্ষুদ্র এক বদ্বীপ নয়। আরও বেশি কিছু। এ বাস্তবতায় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের আগ্রহ শুধু বাড়ছে। মাঝেমধ্যেই ছুটে আসছেন শক্তিশালী দেশের নেতা তথা ক্ষমতাধররা। সেই সঙ্গে তাদের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরাও যারপরনাই ব্যস্ত। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তাদের অন্তহীন ব্যস্ততা। সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদসহ নিয়মিত পরামর্শের সঙ্গে নিজেদের অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করে চলছেন বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা। সরকারের বিরক্তি বা চিঠিতে তারা দমে যাবেন বিষয়টি আর ওই জায়গায় নেই।

কিছুদিন আগে, যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে দেশটির মাটিতে দাঁড়িয়েই দেশীয় স্টাইলে গরম বক্তব্য দিয়ে মিডিয়ায় অভিষিক্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের কথা বলে, আবার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয়ও দেয় বলে দেশটির তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। আবার সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে লবি নিয়োগ দিয়েছেন বলেও শোনা যায়। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা ও ব্যবসায়ীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে‘মার্কিন রাজনীতিকদের সঙ্গে খাতির’ গড়ে তুলতে। সিনেটর-কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে সরকারের কল্যাণে তা ব্যবহার করতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বিভিন্ন বক্তব্য রাখছেন, ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত পিটার হাসও তখন মুখ চালান সমানে। নির্বাচন কমিশন, দুদক কার্যালয়, মন্দিরসহ নানান জায়গা পরিদর্শন করছেন। সরকারকে টার্গেট করে নানা ধরনের কথা বলেই চলছেন তার পূর্বসূরিদের মতো, যা করতে গিয়ে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি ও মন্তব্যের মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাদের। হাসের পূর্বসূরি ড্যান মজিনাকে কটাক্ষ করা হয়েছে ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ বলে। মার্শা বার্নিকাটের গাড়িতে হামলা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালকে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে ‘দুই আনার মন্ত্রী’ বলে। এ অবস্থার মধ্যেও হাল ছাড়ছেন না মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেই চলেছেন‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে চিন্তা করে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সব সংস্থাকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও হবে না, গ্রহণযোগ্য হতে হবে, আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে।’ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি বেশি আসা অন্য মার্কিন কূটনীতিকদের কথাবার্তার মূল বার্তাও এমনই প্রায়।

বসে নেই ঢাকার বিদেশি অন্য কূটনীতিকরাও। চলে যাচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতাদের কাছে। আবার নেতারাও যাচ্ছেন এক্সেলেন্সিদের কাছে। কথার ফাঁকে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেছেন, ‘স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চেয়ে জরুরি অবাধ নির্বাচন’। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস উইটলি তো জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে মিটিংয়ের একটি ছবিই টুইট করে দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে তাদের নিয়মিত সংলাপ চলবে’। আরও ইন্টারেস্টিং ঘটনা হচ্ছে, এই টুইটটি আবার অন্য মিশন প্রধানরা রিটুইট করেছেন। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসছে না। কিন্তু ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের এ দেশের দলগুলোর সঙ্গে ‘নিয়মিত সংলাপ’রাজনীতি-কূটনীতিতে এক নতুন সংযোজন। সব রাজনৈতিক দল তাদের সঙ্গে কথা বলে স্বস্তি পায়। কিন্তু সরকারের জন্য এটি মারাত্মক অস্বস্তির।

মৌখিকভাবে ‘কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ দাবি করলেও ভারতের সঙ্গে অতিবন্ধুত্ব, চীনের সঙ্গে লাভ-লোকসানের বোঝাপড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা বিষয়ে টানাপড়েনে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে রহস্য পাচ্ছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এ রকম সময়ে সীমান্তে গোলা নিক্ষেপসহ বাংলাদেশকে মিয়ানমারের পেয়ে বসার মধ্যেও রয়েছে নানান সমীকরণ। বিষয়টি মিয়ানমারের জন্য পুলকের। শায়েস্তা হওয়ার বদলে মিয়ানমার নতুন করে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসার নমুনা এরই মধ্যে স্পষ্ট। দেশটির ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা চলছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার। নিষেধাজ্ঞা ও প্রায় পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও দেশটি দাপট খাটাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। তাদের একতরফা সমর্থন জোগাচ্ছে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া। মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের নেপথ্য অবস্থান বরাবর বাংলাদেশের বিপরীতে। ভারত দিয়েছে ব্যবহৃত আর্টিলারি, মর্টার, ক্লাস সাবমেরিন। পাকিস্তানও উদার মিয়ানমারের দিকে। দেশটিকে জেএফ-১৭ দিয়েছে পাকিস্তান। ইসরায়েল দিয়েছে উপকূলীয় যুদ্ধযান। এত যুদ্ধাস্ত্র কার বিরুদ্ধে কাজে লাগাবে মিয়ানমার? এ প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট না হলেও ঘুরছে নানা বিশ্লেষণ। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষায় দিল্লির তথাকথিত গ্যারান্টিও আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে ভারতের বাইরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কূটনীতিকদের নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ নিয়ে অতি মাথা ঘামানোর মধ্যে মিডিয়া ও কূটনীতিকপাড়া বেশ গরম।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন ও কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত