মানে নেই বিশ্বকাপে

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২২, ০২:২৮ এএম

৯২ বছরে, ২১টি আয়োজনে যা হয়নি তাই হচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে বিশ্বকাপের প্রথম আসর মাঠে গড়িয়েছিল বছরের মাঝামাঝি সময়ে, জুন-জুলাই মাসে। এরপর সব আসরেই বছরের এই সময়টাতেই হয়েছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। আবহাওয়া, মৌসুম শেষে খেলোয়াড়দের প্রাপ্যতা সব মিলিয়ে এই সময়টাই বিশ্বকাপের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু পেট্রো-ডলার উল্টে দিয়েছে সব হিসাব। কাতার হয়েছে স্বাগতিক, যেখানে জুন-জুলাই মাসে গড় তাপমাত্রা থাকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস! তাই তো অপেক্ষাকৃত কম গরমের সময়টা অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বরকে আয়োজনের জন্য বেছে নেওয়া। ইউরোপের ফুটবল মৌসুমের মাঝের এই সময়টা বের করার জন্যই লিগগুলোতে ম্যাচের মাঝের বিরতি কমিয়ে আনা হয়েছে। ফল একের পর এক ফুটবলারের চোট সমস্যা।

বিশ্বকাপের আগে চোটের কারণে আর্জেন্টিনা দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন জিওভানি লো সেলসো। আকাশি-নীলদের কোচ লিওনেল স্কালোনির পরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিলেন ভিয়ারিয়ালে ধারে খেলা টটেনহ্যামের এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট ছিল লো সেলসোর, অথচ মূলপর্বে তার খেলাই হচ্ছে না হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে, যে চোট সারাতে সার্জনের কাঁচির নিচে যেতে হচ্ছে তাকে।

সেনেগালের সবচেয়ে বড় তারকা সাদিও মানে। তেরাঙ্গার সিংহদের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকারের। ২০২১ সালে আফ্রিকান নেশনস কাপ জিতেছে সেনেগাল, আসরের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন মানে। নিঃসন্দেহে দলটির সবচেয়ে বড় ভরসার নামই ছিল মানে, অথচ বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে নভেম্বরের ৮ তারিখে বায়ার্নের হয়ে ওয়ের্ডার ব্রেমেনের বিপক্ষে বুন্দেসলিগার ম্যাচে হাঁটুতে চোট পান তিনি। শুরুতে তাকে রেখেই দল দিয়েছিলেন সেনেগালের কোচ আলিউ সিসে, আশা করেছিলেন প্রথম ম্যাচটা না হলেও পরের দিকে খেলতে পারবেন মানে। কিন্তু আরও ডাক্তারি পরীক্ষায় জানা যায় অস্ত্রোপচার লাগবেই মানের, তাই খেলা হবে না বিশ্বকাপে। শেষ সময়ে এসে তাই মানেকে বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে সেনেগাল।

স্কালোনির মন্দভাগ্য শুধু লো সেলসো অধ্যায়েই শেষ হয়নি। আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলে কাতারে এসেও দলে দুটো পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছেন আর্জেন্টিনার কোচ। বৃহস্পতিবারের অনুশীলনে ফিটনেস টেস্টে পাস করতে পারেননি নিকোলাস গঞ্জালেস ও ইয়াকিন কোরেয়া। দুজনকেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন স্কালোনি। তাদের জায়গায় ডাকা হয়েছে অ্যাঞ্জেল কোরেয়া ও থিয়াগো আলমাদাকে। বিশ্বের দুই প্রান্তে এই খবরে দুই রকম প্রতিক্রিয়া। চোখের জলে দেশে ফিরছেন গঞ্জালেস ও কোরেয়া, অন্যদিকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো অ্যাঞ্জেল কোরেয়া খবরটা পেয়ে হতবাক। বিস্ময় চেপে তিনি উঠেছেন দোহার ফ্লাইটে।

স্প্যানিশ দলেও বদল আনতে বাধ্য হয়েছেন কোচ লুই এনরিকে। জর্ডানের বিপক্ষে ৩-১ গোলে জেতা ম্যাচে গোটা একাদশই আবর্তন করতে চেয়েছিলেন স্পেনের কোচ, তখনই ধরা পড়ে ডান গোড়ালির চোটে সবার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না ভ্যালেন্সিয়ার লেফটব্যাক গায়া। ব্যাপারটা বেশ ক্ষেপিয়ে তুলেছে এনরিকেকে। কালই গায়াকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছেন কোচ। তার বদলে দলে নেওয়া হয়েছে বার্সেলোনার লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার আলেহান্দ্রো বালদেকে।

চোটগ্রস্ত ফুটবলারের লম্বা তালিকা ভোগাচ্ছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকেও। পল পগবা ও এনগোলো কন্তেকে বাইরে রেখেই দল ঘোষণা করেছিলেন কোচ দিদিয়ের দেশম। দল ঘোষণার পর প্রেসনেল কিমপেম্বেকেও হারিয়েছে রাশিয়া বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা। দল ঘোষণার পর কিমপেম্বে ও ফরাসি দলের ডাক্তারের ভেতর বিশদ আলাপ হয়, নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পেরে নাম প্রত্যাহার করে নেন তিনি। তার জায়গায় দলে অ্যাঞ্জেল দিসাইসিকে নিয়েছেন দেশম।

কপাল মন্দ ক্রিস্টোফার এনকুনকুর। বিশ্বকাপ দলে ডাক পেয়েছিলেন। অনুশীলনে সতীর্থ এদুয়ার্দু কামাভিঙ্গার ট্যাকলে চোট পেয়ে যান এই ফরোয়ার্ড। সেই চোটই তার জায়গাটা কেড়ে নিয়েছে বিশ্বকাপ দল থেকে, অপ্রত্যাশিতভাবে দলে সুযোগ পেয়েছেন র‌্যান্দার কোলো মুয়ানি।

চোটের ছায়া জার্মানি দলেও। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে খেলার সময় চোট পান টিমো ভেরনার। সেই চোটই কেড়ে নিয়েছেন তার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। তার অনুপস্থিতি খুবই বিমর্ষ করেছে জার্মান কোচ হ্যান্সি ফ্লিককে, ‘দলের জন্য বড় ক্ষতি হয়ে গেল। তার মতো একজন ভালো স্ট্রাইকার যার ম্যাচপ্রতি গোলের অনুপাত খুব ভালো, তাকে ছাড়াই আমাদের খেলতে হবে। সে সবসময় দলের জন্য খেলত।’

চোট ২০১৪ সালের বিশ্বকাপেও মার্কো রেউসকে হতে দেয়নি বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলের অংশ। এবারও চোট বিশ্বকাপে খেলতে দিচ্ছেন না রেউসকে।

পর্তুগালের দিয়েগো জোতা লিভারপুলের হয়ে খেলতে গিয়ে অক্টোবরের শেষে চোট পেয়েছিলেন। কাতারে বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে না তারও। ইংল্যান্ডের বেন চিলওয়েল, রিস জেমসও বাদ গেছেন চোটের কারণে।

করোনাকালীন পরিস্থিতি, ইংল্যান্ডের রানীর মৃত্যুসহ অনেক কারণেই লিগের খেলাগুলোর আয়োজনের মাঝে বিরতি ছিল কম। সেই সঙ্গে মৌসুমের মাঝপথে বিশ্বকাপ আয়োজন খেলোয়াড়দের দেয়নি পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও রিকভারির সুযোগ, মেলেনি প্রস্তুতির সময়ও। লিগের খেলা থেকে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে নামতে হচ্ছে অনেককেই। অকাল বিশ্বকাপে তাই একের পর চোটগ্রস্ত হচ্ছেন ফুটবলাররা, মাঠে নামার আগেই ধরতে হচ্ছে দেশে ফেরার ফ্লাইট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত