মুক্তিপণ ‘বাণিজ্যে’ও মাদক

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২২, ০২:৩২ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া বস্তির (চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র) বহুল আলোচিত চরিত্র বজলু মেম্বার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্বিবিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর হত্যাকাণ্ডের পর এ বস্তি ও বজলু মেম্বার ব্যাপক আলোচনায় আসেন।

গত কয়েক দিন বস্তির অপরাধজগৎ সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, ওই বস্তি অপরাধীদের অভয়ারণ্য। মাদক কারবার থেকে শুরু করে অপহরণ খুন সবই হয় সেখানে। এসব নিয়ে যেমন আধিপত্যের লড়াই আছে, তেমনি রাজনৈতিক আধিপত্যের খেলাও আছে। বজলু মেম্বার আলোচনায় আসার কারণ হলো, বর্তমানে বস্তিতে তারই একক আধিপত্য। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিতে না পারলে মাদকদ্রব্য দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চনপাড়া বস্তির একটি টেইলার্সের মালিক নাম প্রকাশ না করে অভিযোগ করেছেন, গত মাসের শুরুর দিকে বজলু মেম্বার তার লোক দিয়ে তাকে বাসায় ডেকে নেয়। সেখানে আটকে রেখে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে ১০০টি ইয়াবা দিয়ে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেয়। নিরুপায় হয়ে তার পরিবার তাৎক্ষণিক ঋণ করে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে ছাড়িয়ে নেয়।

ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বস্তিতে এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে কেউ মুখ খুললে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।’

মো. বজলু রহমান ওরফে বজলু মেম্বার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য। তিনি একই সঙ্গে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের চনপাড়া ইউনিটের (চনপাড়া শেখ রাসেল নগর ইউনিয়ন) সাধারণ সম্পাদক।

র‌্যাবের ওপর হামলার এক মামলায় বজলু মেম্বারকে গতকাল শুক্রবার গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১।

গত আগস্ট মাসে বস্তির চর চনপাড়া বা বাইদ্দাপাড়ার বাসিন্দা মো. শাকিল হোসেনকে বজলু মেম্বারের লোকজন ডেকে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মুক্তির জন্য শাকিলের কাছেও টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু দিতে না পারায় তাকে ইয়াবা ও হেরোইন দিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। ওই মামলায় এখনো কারাগারে রয়েছেন শাকিল।

শাকিলের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মালিবাগে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র তিনি। বস্তির অসহায় মানুষের রক্তদানের কাজে নিয়োজিত অনির্বাণ ফাউন্ডেশনের সভাপতি তিনি। তার এক স্বজন দেশ রূপান্তরকে জানান, বিএনপির নারায়ণগঞ্জের সমাবেশের ভিডিও শাকিল তার ফেইসবুকে শেয়ার করেছিলেন। সেই অপরাধে তাকে ধরে মাদক দিয়ে পুলিশে দিয়েছেন বজলু।

বস্তিবাসীর অভিযোগ, আধিপত্য ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বস্তির নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, প্রতিপক্ষ ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক এভাবেই টার্গেট হচ্ছে। রাস্তা বা বাসা থেকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ভয়ে মুখ খোলে না বস্তিবাসী। অনেক ভুক্তভোগী ইতিমধ্যে বস্তি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, শাকিল বা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তির মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী রয়েছেন চনপাড়া বস্তিতে। যাদের মধ্যে আইসক্রিম বিক্রেতা মো. রতনের কাছ থেকে ৫০ হাজার, বস্তির দোকানি আক্তার হোসেনের কাছ থেকে ৬২ হাজার, যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে কাজ করা কামরুল ইসলামের কাছ থেকে ৫০ হাজার, আলমগীরের কাছে ৫৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বজলু ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী একাধিক পরিবারের দাবি, মুক্তিপণের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর বিষয়টি কাউকে না বলার নির্দেশ দেওয়া হয়। বললে আবার মাদকদ্রব্য দিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। ফলে এতদিন কেউই এসব বিষয়ে মুখ খোলেননি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশও বজলুর কথায় কাজ করে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চনপাড়া বস্তি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ফাঁড়িতে নতুন এসেছি। বজলু মেম্বারের কথায় আমি কোনো লোককে গ্রেপ্তার করিনি।’

পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, বজলুর এসব অপকর্ম পুলিশেরও জানা। ফলে পুলিশ বজলুর কথামতো সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার না করলে বজলু জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ ডেকে মাদকসহ ভুক্তভোগীদের ধরিয়ে দেন।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বস্তিতে মাদকের আধিপত্য, নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং বা রাজনৈতিক বিরোধীদের কৌশলে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে মামলায় জড়ানোর ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। সাধারণত বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশকে বা কর্মসূচিকে সামনে রেখে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়, সে সুযোগই কাজে লাগান বজলু।

বস্তির জ্যেষ্ঠ এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চনপাড়া বস্তি থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচটি ছেলে মেডিকেলে পড়ালেখা করে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত আছেন। অনেকে সরকারি চাকরিও করছেন। অনেকে ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে। শিক্ষিত চাকরিজীবী অনেক ভালো ছেলেকেও বিরোধের কারণে তুলে নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। টাকা দিতে না পারলে তাকে মাদক দিয়ে পুলিশে দেয়। গত চার-পাঁচ বছর সব থেকে খারাপ সময় পার করছে বস্তিবাসী।’

বস্তির সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিজেদের মধ্যে বিবাদ হলে সংঘর্ষে জড়িয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে হামলা চালিয়ে লুটতরাজ করার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। অনেকের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনায় রয়েছে। কোনো প্রতিবাদ করলে মাদক দিয়ে চালান করার ভয় দেখানো হয় এমন অভিযোগ বস্তির ঘরে ঘরে। এ ছাড়া সরকারি সড়ক প্রকল্পের কাজের সময় পাশের ঘর ভাঙার নির্দেশ দেন বজলু। পরে সেসব পরিবারের কাছ থেকে ঘর না ভাঙার আশ্বাস দিয়ে ১০-২০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

বস্তির নারীদের ওপরও চলে নানা নির্যাতন। বস্তির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এক নারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বস্তির সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো উঠতি বয়সী মেয়েদের নোংরা প্রস্তাব দেয়। কেউ যদি রাজি না হয় তাহলে রাতে তুলে নিয়ে যায়। সম্প্রতি চার নারীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তারা ভয়ে বস্তি ছেড়ে পালিয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত