লিওনেল মেসির নাকি শেষ বিশ্বকাপ! এ কথা শুনেই রেগে আগুন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ‘না, না... সে পাগল নাকি! কাতার তার শেষ বিশ্বকাপ হয় কীভাবে? তাকে আমরা যেতেই দেব না। দরকার হলে তাকে রাখতে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেব।’ সতীর্থরা মেসিকে ধরে রাখতে যুদ্ধ করতেও রাজি। অথচ খুদে জাদুকর এই অক্টোবরেই বলেছেন কাতার বিশ্বকাপ তার শেষ। তবে হাওয়া দিক বদল করতেই পারে। ধরা যাক ১৮ ডিসেম্বর লুসাইলে সোনালি ট্রফিটা উঁচু করে ধরলেন মেসি। আনন্দের সাগরে ভাসলেন আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা গায়ে। বাড়ি ফিরলেন, পরিবারের সঙ্গে হালকা মেজাজে কাটালেন কিছুদিন। এরপর মনে হলো আরও খেলা যায়। মেসির মনের এই বদল সতীর্থরাই শুধু না চাইছে কোটি কোটি ভক্ত। ক্যামেরুনের রজার মিলা ৩৮ ও ৪২ বছরে পরপর দুই বিশ্বকাপ খেলে ফেললে মেসি কেন নয়! তার আগে অবশ্য এই বিশ্বকাপ মেসির হওয়া চাই। মেসির হওয়া মানেই তো আর্জেন্টিনার।
খেলায় নাকি ব্যক্তির চেয়ে দল বড় নয়। মেসির জন্য এই নিয়ম অনায়াসে পাশে রাখা যায়। আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি তা করেও দেখিয়েছেন। একটু পেছনে যাওয়া যাক। ২০১৮ বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন কিনা কিছুই বলছিলেন না। খেলেন ওই বছরের বাকি সময়। বছর গড়িয়ে ২০১৯ এলেও মেসির খেলা নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। পৃথিবীর আর কোনো খেলোয়াড়ের জন্য কোনাে দল হয়ত অপেক্ষা করত না। স্কালোনি করেছিলেন। দফায় দফায় মেসির সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তাকে বুঝিয়েছেন নতুন দল, নতুন গ্রুপ তৈরি করছেন তিনি, যারা দেশের জন্য মাঠে জীবন দিতেও প্রস্তুত। অবশেষে বরফ গলে, মেসি নীরবতা ভেঙে ২২ মার্চ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলে ফেরেন। এরপর শুধু দল নয়, আর্জেন্টিনার প্রতিটি সদস্য মেসির জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
মেসিকে ঘিরে এমন একটি গ্রুপ নিয়ে এবার আর্জেন্টিনা কাতারে। তাদের অর্জন চোখে দেখারও আছে, উপলব্ধিরও আছে। চোখের দেখার অর্জন সবশেষ কোপা আমেরিকা। মেসিকে একটি শিরোপা এনে দিতে নিজেদের সবটুকু দিয়েছেন রদ্রিগো ডি পল, লাউতারো মার্তিনেজ, লিসান্দ্রো মার্তিনেজরা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে সেবার পরম আরাধ্য শিরোপা পেয়েছিলেন মেসি। ওই সাফল্যের রেশ ধরেই এবার বিশ্বকাপের ফেভারিট আর্জেন্টিনা।
উপলব্ধির জায়গাটা মেসিকে ঘিরে। দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের নতুন জাগরণে আশার আলো জ্বলছে হাজার পাওয়ারে। আর্জেন্টাইনদের বিশ্বাস এবার কিছু হবেই। কারণও আছে। দলটিকে ঘিরে চিরায়ত প্রবাদ রক্ষণে দুর্বল। এবার স্কালোনি এই রক্ষণটাই গুছিয়েছেন আগে। তাগলিয়াফিকো, মার্তিনেজ, আকুনা, ফয়েথ, ওতামেন্দি, মন্তিয়েল ও মলিনারা আছেন। তাদের নিয়ে গড়া রক্ষণদুর্গ এতই শক্ত যে কোপা আমেরিকার পর গত ১৫ ম্যাচে মাত্র তিনটি গোল হজম করেছে আর্জেন্টিনা। তবুও রক্ষণ ভরসা নয় স্কোলোনির, জোর দিচ্ছেন স্মার্ট ফুটবলে, ‘যে দলগুলো ভালোভাবে রক্ষণ সামলেছে, তারাই বিশ্বকাপ জিতেছে এমন কিছু বলার চেয়ে আমি বলব স্মার্ট, সতর্ক দলগুলোই শিরোপা জেতে। তারা জানে কখন আক্রমণ করতে হয়, কখন রক্ষণ সামলাতে হয়। বুদ্ধিমত্তা ফুটবলের অংশ।’ ফুটবল বুদ্ধিতে এগিয়েছে বলেই আর্জেন্টিনা এখন সেরাদের মধ্যেও অন্যরকম। তাই বর্তমান দলটির মাঝে বিশ্বকাপ জয়ের স্পৃহা দেখছে সমর্থকরা। দেখেছে কিছু অর্জনের জন্য ইচ্ছের আগুন। যে আগুনে পুড়বে প্রতিপক্ষরা।
লো সেলসোর ইনজুরিটাই উৎসব মাটি করে দিয়েছে। নয়ত শতভাগ পরিপূর্ণ এক দল নিয়ে কাতারে পা রাখা হতো মেসিদের। অবশ্য সেলসো ছাড়াও শক্তিতে কম যায় না আলবিসেলেস্তেরা। মধ্যমাঠে তরুণ লিয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো ডি পল, প্যালাসিওস ও গুইদো রদ্রিগেজরাই এখন অভিজ্ঞ। আর ফরোয়ার্ডে বিশ্বসেরা মেসিকে ঘিরে ডি মারিয়া, পাওলো দিবালা ও লাউতারোদের নিয়ে সেরা লাইনটাই গড়া। কোনো অঘটন না হলে সৌদি আরব, মেক্সিকো ও পোল্যান্ড নিয়ে গড়া সি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে আর্জেন্টিনা। এরপর শেষ ১৬, কোয়ার্টার, সেমিফাইনাল হয়ে ফাইনালের পথটা কঠিন হলেও এই আর্জেন্টিনার জন্য সব বাধাই উতরে যাওয়া সহজ।
তার কারণ গত ৩৫ ম্যাচ অজেয় থেকে বিশ্বরেকর্ডের দিকে এগোচ্ছে আর্জেন্টিনা। আর দুই ম্যাচ না হারলে ইতালির অজেয় থাকার বিশ্বরেকর্ড ৩৭ ম্যাচ ছুঁয়ে ফেলবেন মেসিরা। এই ধারা এগিয়ে নিলে অজেয় থেকেই তো বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা!
মেসিদের বিশ্বকাপ জেতাতে পরিসংখ্যান নিয়েও হাজির ইএ স্পোর্টস। এই প্রতিষ্ঠান গত তিন বিশ্বকাপ জয়ীর নাম সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে। এবার তাদের ভবিষ্যদ্বাণীতে উঠেছে আর্জেন্টিনার নাম। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল ইএ স্পোর্টস বলছে ব্রাজিলকে হারিয়েই বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা।
তবে যাই হোক, পরিসংখ্যান-প্রতিশ্রুতি-ভবিষ্যদ্বাণী পাশে থাক। এই বিশ্বকাপ সত্যিকার অর্থেই মেসির এবং তার জন্য আর্জেন্টিনারও। তা মেসি বিশ্বকাপ জিতুন বা নাই জিতুন!
