বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জঙ্গি ছিনতাই

দায়িত্বে অবহেলায় পাঁচ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০১:৪৯ এএম

ঢাকার আদালত থেকে দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে পুলিশের পাঁচ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে ঊর্ধ্বতন কারোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের পর গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। থানায় দায়ের হওয়া মামলাটি তদন্ত করছে সিটিটিসি। পালিয়ে যাওয়ার সময় ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেলের মালিককে শনাক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের প্রধান মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হকের পরিকল্পনায় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেলের মালিক পুরান ঢাকার এক বাসিন্দা। তবে ছিনিয়ে নেওয়া জঙ্গিরা এখনো ধরা না পড়লেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করছে, তারা নজরদারিতেই রয়েছে। রাজধানীর আদালতপাড়া থেকে শুরু করে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গিসহ তাদের সহযোগীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

সোমবার সন্ধ্যায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সিটিটিসির প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার সঙ্গে আরও কারা কারা ছিল, এ রকম বেশ কয়েকজনের নাম আমরা পেয়েছি। কিন্তু এই মুহূর্তে তদন্তের স্বার্থে ব্যক্তির নাম-পরিচয় আমরা বলতে চাচ্ছি না।’

পুলিশের ৫ সদস্য সাময়িক বহিষ্কার : আদালতপাড়া থেকে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বরত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগ। সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সাময়িক বরখাস্ত পুলিশ সদস্যরা হচ্ছেন সিএমএম আদালতের হাজতখানার কোর্ট ইন্সপেক্টর মতিউর রহমান, হাজতখানার ইনচার্জ (এসআই) নাহিদুর রহমান ভূঁইয়া, আসামিদের আদালতে নেওয়ার দায়িত্বরত পুলিশের এটিএসআই মহিউদ্দিন, কনস্টেবল শরিফ হাসান ও আব্দুস সাত্তার।

ডিবির প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেছেন, আদালতপাড়া থেকে ছিনিয়ে নেওয়া মৃতুদ-প্রাপ্ত দুই জঙ্গিসহ তাদের সহযোগীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। এ ছাড়া জঙ্গিদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। জঙ্গি ছিনতাইয়ের মামলায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১২ জন আসামির ১০ জনকে ১০ দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশ। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া জঙ্গি আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

জঙ্গি ছিনতাইয়ের মোটরসাইকেল উদ্ধার : জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল পুরান ঢাকার হাসান আল মামুনের। রবিবার দুপুরে দুই জঙ্গি আসামিকে ছিনিয়ে নিতে দুটি মোটরসাইকেল আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় ওই মোটরসাইকেল দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে আদালতের প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় একটি মোটরসাইকেল ফেলেই চলে যায় জঙ্গিরা। ঘটনার দিন পুলিশ সেই মোটরসাইকেলটি কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ জব্দ তালিকায় তা রেখেছে। বিআরটিএ জানায়, ঢাকা মেট্রো-ল-৩১-৫৭১০ নম্বরের ওই মোটরসাইকেলটি ১৬০ সিসির হোন্ডা ব্র্যান্ডের হরনেট মডেলের। মোটরসাইকেলটির নিবন্ধন হাসান আল মামুন নামে এক যুবকের। তিনি পুরান ঢাকার বাসিন্দা। মোটরসাইকেলটির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি। গাড়িটির ইঞ্জিন নম্বর কেসি৩৯ইএ০০০ এবং চেসিস নম্বর পিএস০কেসি ৩৯৯০কেএইচ।  রেজিস্ট্রেশন আইডি ৬২-৩৮৪৪৫৯১। হাসান আল মামুনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন : ডিএমপির পর পুলিশ সদর দপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশ হেড কোয়ার্টারের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার এ এইচ এম কামরুজ্জামানসহ কমিটির অন্য সদস্যরা। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন। কমিটির সদস্যরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রধান ফটক, সিএমএম আদালতের হাজতখানা, ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন বলেন, তদন্তের কাজে সার্বিক বিষয় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এদিকে এ ঘটনার পর আদালতপাড়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় আসামিদের আদালতের এজলাসে তোলা হচ্ছে।

গাজীপুরে আদালত, কারাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা : সোমবার থেকে গাজীপুর আদালত এলাকা এবং কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে দেখা গেছে, প্রধান ফটকে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কারাগারের প্রধান ফটকে গিয়ে আরপি চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা কারারক্ষীদের ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে জনবলও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন কারাগার এলাকা কঠোর নজরদারিতে রাখছেন। আদালতে আসা বিচার প্রার্থীসহ সব শ্রেণির লোকদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবির বাড়তি সতর্কতা : চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, দুই জঙ্গির ছবি ও ঠিকানা পাঠানো হয়েছে জয়নগর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুলিশের কাছে। বিজিবির ৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল  শাহ মো. ইশতিয়াক জানান, দুই জঙ্গি যেন সীমান্ত দিয়ে পালাতে না পারে, সে জন্য গতকাল বিকেলে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা আসে। জেলার সব সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে।

বেনাপোল বন্দর এবং সীমান্তে ‘রেড অ্যালার্ট’ : শার্শা (যশোর) প্রতিনিধি জানান, যশোর সীমান্তে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  এ অবস্থায় চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন ও যশোর সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আখাউড়া সীমান্তে সতর্কতা : আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, আখাউড়া স্থলবন্দর পুলিশ ইতিমধ্যেই ওই দুই জঙ্গিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। বিজিবির প্রতিটি বর্ডার পোস্টে সতর্ক থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ দেওয়ান মোর্শেদুল হক জানান, ওই দুই জঙ্গির ছবি ও ঠিকানা তাদের দেওয়া হয়েছে। তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের ছবি ইমিগ্রেশন কক্ষে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত