আমি যারপরনাই রোমাঞ্চিত কারণ ইউক্রেন অবশেষে আমার শহর খেরসনকে মুক্ত করেছে। তবু সামনে রয়েছে অসংখ্য সমস্যা। শহরে পানি, গ্যাস বা বিদ্যুৎ নেই। মানুষ ক্ষুধার্ত এবং শীতার্ত। এবং আরও কিছু নৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে যেমন অভিযুক্ত দেশদ্রোহীদের ব্যাপারটা।
আমার পুরনো হাই স্কুলের পৌরনীতির শিক্ষক ৫৬ বছর বয়সী তাতায়ানা টমিলিনার গল্পটাই ধরুন। মার্চ মাসে যখন রুশ সেনারা খেরসন দখল করে, তখন তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত বলে মনে হয়েছিল টমিলিনাকে; তার এরই মধ্যে একজন রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে খ্যাতি ছিল। তারা এই নারীকে খেরসন স্টেট ইউনিভার্সিটির রেক্টর নিযুক্ত করেছিল। রেক্টর পদটি একটি উচ্চমানের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পদ, যা শুধু এমন একজনের কাছে যেতে পারে যাকে রুশরা বিশ্বাস করে যে দখলদার সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক।
আগস্টে, ইউক্রেন সরকার তার কার্যকলাপের একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে এবং যুদ্ধে সহযোগিতার অপরাধ করার জন্য তাকে ‘সন্দেহভাজন’ বলে ঘোষণা করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রুশ প্রোপাগাণ্ডার কথিত প্রচার; বিশ্ববিদ্যালয়ে রুশ পাঠ্যক্রমের বাস্তবায়ন; এবং একটি নতুন প্রজন্মকে রুশপন্থি সাংবাদিক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রচেষ্টা। সমালোচকরা দাবি করেছিলেন যে এটি একটি ‘মিডিয়া স্কুল’র ছদ্মবেশে চলছিল।
১২ সেপ্টেম্বর, তার খেরসনের বাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি ঘোলাটে, তবে এটি ব্যাপকভাবে অনুমান করা হয় যে আক্রমণটি ইউক্রেনীয় পক্ষের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যারা রুশদের সঙ্গে কাজ করার জন্য তাকে নিশানা করেছিল। তিনি বেঁচে গেলেও নিজেকে আবিষ্কার করেন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। এক ব্যক্তি, দৃশ্যত তার নিরাপত্তারক্ষী, ঘটনাস্থলেই মারা যায়। টমিলিনা সম্পর্কে আমার অনুভূতি যুদ্ধের আগেও মিশ্র ছিল। আমি তার ক্লাস কখনোই পছন্দ করিনি। প্রশ্ন করলে তিনি ভালোভাবে জবাব দিতেন না। মনে হয় শিক্ষার্থীদের ধমকানোতেই তিনি মজা পেতেন। আমি খুশি ছিলাম কারণ তিনি আমাদের শুধু এক সেমিস্টারেই ক্লাস নিয়েছিলেন।
স্কুলে যা আমি সত্যিই উপভোগ করেছি তা হলো ভাষা শিক্ষার ক্লাসগুলো। আমি রুশ ভাষাভাষী হলেও, একাধিক ইউক্রেনীয়-ভাষার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি : প্রথমে, আমি আমার ক্লাসের প্রতিনিধিত্ব করেছি, তারপর আমি অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শহর পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করেছি। এবং আমি গোটা ইউক্রেনের সেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করেছি। আমার ইউক্রেনীয় ভাষার শিক্ষক ছিলেন আল্লা লুকিভ। এখন তার বয়স ৬২ বছর। তিনিই আমাদের এই প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আমরা যারা রুশ ভাষাভাষী খেরসন অঞ্চলের শিশু, তারাও ইউক্রেনীয় ভাষার প্রতিযোগিতায় সমান তালে পারফর্ম করি। এবং আমরা সেটা করেছিও।
সম্প্রতি, প্রায় ২০ বছর পরে, আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি কিয়েভ শহরের বাইরে একটি গ্রামে ভাড়াবাড়িতে থাকেন। জুলাই মাসে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি আর রুশ দখলদারিত্বের অধীন খেরসনে তার জীবন চালিয়ে যেতে পারবেন না। ফেব্রুয়ারি আক্রমণের আগে, তিনি ইউক্রেনীয় ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন; শিক্ষিত করেছিলেন শত শত স্বাধীন ইউক্রেনীয় তরুণকে। রুশ দখলদারিত্বের অধীনে তার সম্ভাবনা হ্রাস পাচ্ছিল।
এই সেই শিক্ষিকা, আজ আমাকে ইউক্রেনীয় স্টাইলে মাটির তৈরি পাত্রে লবণ এবং মরিচমিশ্রিত খাবার এনে দিয়েছিলেন। আমি যে অবশেষে বিয়ে করেছি এতে তিনি মহাখুশি। তিনি দেখতে প্রায় একই রকম আছেন; তার চোখ এখনো চকচক করছে। বিগত ২০ বছরের সমস্ত বিবরণ তিনি জানতে চেয়েছিলেন। তিনিই প্রথম আমাকে কিয়েভ শহরে নিয়ে এসেছিলেন। আমার মনে আছে শহরটি কত বড় মনে হয়েছিল এবং জনাকীর্ণ পাতাল রেলে চড়তে আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম।
আমি স্কুল থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর, লুকিভ আমাকে বলেছিলেন, তিনি টমিলিনার সঙ্গে একটা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন এবং অন্য কোথাও চাকরির জন্য চলে যাবেন। টমিলিনা তিন বছরের জন্য আমাদের স্কুলের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন; পদে ছিলেন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। একই বছর তিনি খেরসনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু তার প্রচারণা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল; তিনি মোট ভোটের মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি পেয়েছিলেন। প্রচারণার পরে, তিনি স্থানীয় টিভিতে প্রচারিত একটি ভিডিওর কারণে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ওই ভিডিওতে তিনি গোপন ‘পেন্টাগন ল্যাবরেটরি’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে খেরসনে এর অস্তিত্ব রয়েছে। দেখা গেল যে তিনি রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের জন্য আঞ্চলিক কেন্দ্রের কথা বলছিলেন, যার পরীক্ষাগারটি পশ্চিমা দাতাদের পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রায় প্রতিটি অন্যান্য রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সুবিধা থেকে সহায়তা পেয়েছে। এর পরের বছরগুলোতে, ‘গোপন ন্যাটো পরীক্ষাগার’ সম্পর্কে জঘন্য অভিযোগ রুশ প্রোপাগাণ্ডার মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
এই দাবিটি তিনি রুশপন্থি কিরিল স্ট্রেমাসভের সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন, যিনি পরে বেদখল হওয়া শহরের প্রশাসনের একটি শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি খেরসনের সাবেক মেয়র এবং রুশপন্থি দলগুলোর বিশিষ্ট সদস্য ভøাদিমির সালদোর ডেপুটি হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই ভøাদিমির সালদো দখলদার কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক খেরসন অঞ্চলের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সালদো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে পর্যন্ত সাক্ষাৎ করতে এবং সেপ্টেম্বরের শেষে খেরসনকে রাশিয়ার সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ করার নথিতে স্বাক্ষর করতে মস্কো গিয়েছিলেন। স্ট্রেমাসভ গত সপ্তাহে খেরসন থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি-সংঘর্ষে নিহত হন; পুতিন তাকে মরণোত্তর একটি পদক প্রদান করেন।
‘আমার মতো লোকরা মনে করে যে, রাশিয়া এখানে আজীবন থাকবে এবং রাশিয়া আমাদের রক্ষা করবে’ জুলাই মাসে রুশ মিডিয়ার সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে টমিলিনা এ কথা বলেছিলেন। এখন তো খেরসন ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে ফিরে এসেছে, অনিশ্চিত রয়ে গেছে টমিলিনার ভাগ্য। অন্যদিকে, লুকিভ আত্মবিশ্বাসী। কারণ তিনি দেশে ফিরে আসবেন এবং দখলদারত্বের শেষ হওয়ার পরে তিনি ইউক্রেনীয় ভাষা শেখানো চালিয়ে যাবেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, গণতন্ত্রের অদৃশ্য ক্ষমতা আমাদের শক্তিশালী এবং আরও স্থিতিস্থাপক করে তুলেছে এবং ইউক্রেনের জন্য আর রাশিয়ার কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
‘রুশ ভাষাভাষী খেরসনে ইউক্রেনীয় ভাষা শেখানোর ৪০ বছর পর, আমি কখনোই ভাবিনি যে জনগণ ইউক্রেনের জন্য এত কঠিন লড়াই করবে’ তিনি বলেছিলেন। ‘এই যুদ্ধটি খেরসনের জনগণকে ইউক্রেনের সঙ্গে আগের চেয়ে আরও শক্তভাবে পরিচিত করেছে।’ আমি কখনোই সন্দেহ করিনি যে খেরসনের বেশির ভাগ লোক কিয়েভের প্রতি অনুগত। তবে সেখানে গুপ্তচর এবং তথ্যদাতাসহ বহু রুশ সহযোগী রয়েছে। এখন এই স্বাধীন শহরে তাদের চিহ্নিত করা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
লেখক : সাংবাদিক, ‘দ্য ফাইট অব আওয়ার লাইভস’ বইয়ের লেখক এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাবেক প্রেস সচিব।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর করেছেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোরশেদুল ইসলাম
