গ্যাস, জ্বালানি, ডলারসহ অর্থনীতির সার্বিক সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনের অস্থিরতা তালিকাভুক্ত কোম্পানির ব্যবসা ও মুনাফা নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তায় বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী সাইড লাইনে চলে গেছেন। তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ফ্লোর প্রাইসে নেমে আসায় সেগুলোর লেনদেন হচ্ছে না বললেই চলে। এমন প্রেক্ষাপটে শেয়ার লেনদেন সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্নে নেমেছে।
গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৩২৩ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম। চলতি বছরের ১৯ জুলাইয়ের পর গতকালই ডিএসইতে সবচেয়ে কম লেনদেন হয়েছে। ওই দিন ডিএসইতে ৩১৯ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) কেনাবেচা হয়েছে মাত্র সোয়া ১৩ কোটি টাকার শেয়ার।
গত এক বছরে এ নিয়ে তিন দিন লেনদেন ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নামল। যদিও মাত্র ১২ কার্যদিবস আগেও গত ৮ নভেম্বর এ বাজারের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতা স্বল্পতার কারণে টানা দরপতন দেখা দিয়েছে। আর এতে ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন সক্রিয় বিনিয়োগকারীরা। যেসব কোম্পানির দর এখনো ফ্লোর প্রাইসের ওপরে রয়েছে, সেগুলো নিয়মিত দর হারিয়ে বিনিয়োগকারীর লোকসান আরও বাড়িয়ে তুলছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন ফ্লোর প্রাইসের বাইরে থাকা শেয়ার ধরে রাখলেই লোকসান বাড়ছে। তাই সবাই শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে ফিরতে চাইছেন। অন্যদিকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কোম্পানি ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকায় বিনিয়োগকারীরা চাইলেও শেয়ার বিক্রি করে বের হতে পারছেন না।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তবে এর থেকেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্লোর প্রাইস। এ মুহূর্তে বাজারের ৭৬ শতাংশ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে। এমনকি দুই শতাধিক শেয়ারের লেনদেন নেই বললেই চলে। যে শেয়ারই ফ্লোর প্রাইসে নেমেছে, তার লেনদেন শূন্য বা কাছাকাছি পর্যায়ে নেমেছে। এটাই লেনদেন কমার কারণ।
বাজারের এমন পরিস্থিতিতে প্রায়ই ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া হচ্ছে বলে গুজব ছড়ানো হয়। যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি জানিয়েছে, এখনই ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা নেই। তবে বৈশি^ক পরিস্থিতিতে সব ধরনের কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস-জ¦লানি ও ডলার সংকট তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় বর্তমান দরে অনেক বিনিয়োগকারী হয়তো শেয়ার কেনার সাহস করছেন না। হয়তো ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে কম দামে পেলে অনেকে শেয়ার কিনতেন। কিন্তু সে সুযোগ নেই। আবার এসব শেয়ারে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের বিনিয়োগ আটকে গেছে। এভাবেই লেনদেন কমছে।
গতকালের লেনদেন পর্যালোচনায় ব্রোকারদের পর্যবেক্ষণের সত্যতা মিলেছে। তালিকাভুক্ত ৩৯০ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ৩০০টির কেনাবেচা হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে এজিএম সংক্রান্ত রেকর্ড ডেটের কারণে ২৯ কোম্পানির লেনদেন বন্ধ ছিল। বাকি ৬১ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের এমনিতেই কোনো লেনদেন হয়নি।
গতকাল ডিএসইতে ৩০০ শেয়ার কেনাবেচা হলেও এর মধ্যে লেনদেনের শীর্ষে থাকা জেনেক্স ইনফোসিসের প্রায় ২৫ কোটি টাকার পৌনে ৮ শতাংশ লেনদেন হয়েছে। লেনদেন বেশ খানিকটা কমলেও গতকাল ডিএসইতে ৪৬ শেয়ারের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ২৮টির দর কমেছে। অপরিবর্তিত ছিল ২২৬টির দর। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭ পয়েন্ট বেড়ে ৬২১৫ পয়েন্টে উঠেছে।
