দার্শনিক মিশেল ফুঁকো শাসনব্যবস্থায় যোগ্যতার মূল শর্তের ক্ষেত্রে শাসকের সামর্থ্য বা শাসিতকে মানিয়ে নিয়ে চলার সক্ষমতাকে নির্দেশ করেছেন। একটি রাজনৈতিক সমাজ বা জাতিকে আপনি কেন শাসন করবেন বা কোন যুক্তিবলে শাসন করার ক্ষমতা রাখেন, তার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে আপনার সক্ষমতা আর আপনার আবির্ভাবের যৌক্তিকতা। এই দুটোই আসলে আপনাকে রাষ্ট্র চালানোর ম্যান্ডেট আর বৈধতা দেয়। সাংবিধানিক আইনে এই কারণে Doctrine of Necessity এর পাশাপাশি Doctrine of Necessity এর প্রয়োগ ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই, ক্ষমতার বৈধতা বা সক্ষমতা নয়। তাই অনেক সময় গণতান্ত্রিক সরকারও সক্ষমতার পরিচয় না দিতে পেরে, ক্ষমতার বৈধতা হারিয়েছে।
সরকার বলতে শুধু কয়েকজন মন্ত্রী বা আমলাকে বোঝায় না। সরকার বলতে বোঝায় একটি রাজনৈতিক শাসনামলে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান আর তাদের কর্র্তৃপক্ষকে, যাদের একটি রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তাই, সরকারের মন্ত্রী, স্থানীয়-সরকার, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্র্তৃপক্ষ, সরকারি বিভিন্ন কমিশনের কর্তাব্যক্তি এদের সবার সক্ষমতা দরকার সরকার পরিচালনায় অংশীদারত্বের জন্য। শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে নিয়োগ দিলে কোনো কাজ হবে না। কারণ, জোর করে বসিয়ে দিলেও, জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া সরকারের নীতি-নির্ধারণকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলবে। এখন Doctrine of Necessity বা ‘অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা’র যুগ। সরকারি প্রায় সব ব্যবস্থাপনা নাগরিকরা জানতে পারে; আবার নাগরিকের প্রতিক্রিয়াও সরকারের অজানা থাকার কথা নয়। টেকনোলজি সরকার আর জনগণকে খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। মন্ত্রী-এমপিদের কথার জবাব সরাসরি দিতে না পারলেও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ ঠিকই তার প্রতিক্রিয়া জানায় নিয়মিত।
তথ্য প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন আর শিক্ষা নাগরিকদের আগের তুলনায় অনেক সচেতন করেছে। এমন সচেতনতা সতিই আগে আর দেখা যায়নি। ষাট বা সত্তর দশকের প্রজন্ম রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল বা তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখাত না; তাদের একমাত্র প্রতিক্রিয়া ছিল সরকার নির্বাচনের দিন একটা ভোট দেওয়া। সেই ভোটও যে দেশের মানুষ খুব সচেতনভাবে প্রয়োগ করত তেমনটা দেখা যায়নি। কোনো এক নেতার কথায়, বা টাকায় ভোট কেনাবেচা চলেছে অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু, এখন নাগরিকরা সাংঘাতিক সচেতন। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত, কাজ, এমনকি একটা কথাও আজ মাটিতে পড়ার সুযোগ নেই। কোনো কিছু করে, গোপন করারও সুযোগ নেই। সাবেকি স্টাইলে বক্তৃতা-নির্ভর শাসনব্যবস্থা দেখতে মানুষ আজ আর রাজি নয়। গত ১০ বছরে, মানুষের সচেতনতায় সাংঘাতিক পরিবর্তন এসেছে। আজ যে কেউ চাইলেই তার স্মার্টফোন দিয়ে নিউজ বা রিপোর্ট করতে পারে, ফেইসবুকে বা ইউটিউবে তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে। এই তথ্যপ্রবাহের যুগে মানুষকে আর বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ আজ প্রচণ্ডভাবে যুক্ত। তাই শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কর্র্তৃপক্ষ কোনো কিছু করলে, মানুষ তার mass-trial করে ছাড়ে। কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতার অবস্তুনিষ্ঠ, মিথ্যা বা চাপাবাজি মার্কা বক্তব্যের নিচে পড়ে হাজার হাজার হা হা রিয়েক্ট। বাপ-বাপান্ত করা কমেন্টে ভরে যায় রাজনৈতিক সংবাদের পোস্ট। আপ্রাসঙ্গিক, অমূলক, আর অসত্য তথ্য দিয়ে কথা বলার কারণে, অনেক রাজনৈতিক নেতাই হচ্ছেন হাসির পাত্র। বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে, সরকারদলীয় নেতারা বা কর্তাব্যক্তিরা যখন অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা দেন, তখন মানুষ আর সেগুলো বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ এই ইন্টারনেটের যুগে তথ্যের ভাণ্ডার মানুষের মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপে। ‘আমাদের চেয়ে পাশ্চাত্যের মানুষ খারাপ আছে’ এমন কথা বললে মানুষ হাসে, রাগ আর ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে।
বাংলাদেশিরা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের মধ্যেই অনেক বেশি আন্তর্জাতিক। এরা বিদেশে পড়তে যায়, কাজ করতে যায়, বিনোদনের জন্যও যায়, তাই এরা দেশ-বিদেশ সম্পর্কে যথেষ্ট খবর রাখে। এদেশে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষকেও আজ ব্লগার হতে দেখা যায়, শুধু মোবাইল আর ইন্টারনেটের কল্যাণে। তাই, কোন দেশের তেলের দাম বা চিনির দাম কত, এরা সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে। কোন দেশের লোক কয় বেলা খাচ্ছে, আর কয়দিনে একবার গোসল করছে, তা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে মানুষকে জানতে হয় না। সোশ্যাল মিডিয়াতে যারা রাজনৈতিক সমালোচনায় মত্ত থাকে, তারা যে সব সময় রাজনৈতিক দলের সদস্য এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। সাধারণ মানুষই আজ অনেক সমালোচনা-প্রবণ। তারা জানে, শুনে এবং বোঝে। একাধিক সোর্স থেকে তাদের এখন জানার সুযোগ আছে। কারও দ্বারা সহজে তাদের এখন প্রভাবিত করা সম্ভব নয়।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গিয়ে, কিছু উপাচার্যের সমালোচনা করে বলেন যে, তাদের কর্মকাণ্ডে বিব্রত হতে হয়। অথচ যত্রতত্র মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় খুলে, অতি রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়াতে, এমন ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে। সক্ষমদের বাদ দিয়ে অক্ষমদের দিয়ে যে কোনো প্রতিষ্ঠান চালানোতেই বিপদ, এটা শাসকদলীয় নীতিনির্ধারকরা বুঝতে চান না। এ জাতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে, রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন আর ক্রিটিক্যাল। তাই তো, সক্ষমতার সঙ্গে ও যৌক্তিকভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা আজ অনেক বেশি প্রয়োজন।
এমন একটা জাতিকে শাসন করবার জন্য কি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা যথেষ্ট প্রস্তুত? অবস্থাদৃষ্টে কিন্তু তা মনে হয় না। সেকেলে রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা, অন্য দলের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণতা, অসম্মান, সস্তা রাজনৈতিক ডায়ালগ যেমন ‘খেলা হবে’, বা অন্য কোনো চাপাবাজি বা গলাবাজি করে আর পার পাওয়া যাবে না। যারা সৎ, সমর্থ, যৌক্তিক তারাই টিকে যাবে রাজনীতিতে। সংখ্যার রাজনীতি হয়তো ভোটের মাঠে ভূমিকা রাখবে, কিন্তু সক্ষমতার রাজনীতি ছাড়া শাসনব্যবস্থা চালানো সম্ভব হবে না। এদেশের মানুষ যথেষ্ট আবেগপ্রবণ! এরা যার ওপর আস্থা রাখে, তাদের মাথায় তুলে নাচে, আর যাদের ওপর থেকে আস্থা হারায় তাদের ছুড়ে ফেলতে এক মুহূর্তও সময় নেয় না। দুর্নীতিপ্রবণ বাংলাদেশে মানুষ আর দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি কোনোটাই দেখতে চায় না। তাই সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ছাড়া, আগামীর বাংলাদেশ ও আগামীর রাজনীতি কোনোটাই চালানো সহজ হবে না।
লেখক : শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
