আ.লীগই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০১:৪৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রিজার্ভ সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্তকারী ব্যক্তিদের নিন্দা করে বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত রিজার্ভ রয়েছে এবং রিজার্ভ জনসাধারণের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার সরকার জনগণের কল্যাণে সম্ভাব্য সবকিছু করবে, কাউকে ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক যে আমাদের রিজার্ভ থেকে (দেশবাসীর কল্যাণে) খরচ করতে হবে। আমাদের কাছে এত পরিমাণ রিজার্ভ মানি আছে যে আমরা পাঁচ মাসের জন্য খাদ্য আমদানি করতে পারি, যদিও যেকোনো দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে তিন মাসের জন্য খাদ্য আমদানির জন্য রিজার্ভ থাকতে হয়।’

চাল, গম, ভোজ্য তেল, জ¦ালানি তেল এবং ভ্যাকসিন আমদানিসহ জনগণের কল্যাণে রিজার্ভ ব্যবহার করা হচ্ছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘মানুষ রিজার্ভের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছে এবং তারা চা-স্টলে ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় রিজার্ভ নিয়ে আলোচনা করছে। কভিড-১৯, ভর্তুকি দেওয়া, কিছু প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধ করায় এই টাকা ব্যয় হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়া যে রিজার্ভ রেখে গিয়েছিল তা থেকে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এ নির্বাচিত হয়ে ২০০৯ সালে যখন সরকার গঠন করে, তখন সেই রিজার্ভ ছিল ৫ বিলিয়নের কিছু ওপরে। করোনাকালে যেহেতু আমদানি বন্ধ ছিল, রেমিট্যান্স সরকারিভাবে এসেছে, কোনো হুণ্ডি ব্যবসা ছিল না, কোনো রকম খরচ ছিল না তাই আমাদের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ তাদের সকল ঋণ সব সময় সঠিকভাবে পরিশোধ করে এসেছে এবং একবারের জন্যও ঋণখেলাপি হয়নি।’ সরকারের যত সমস্যা হোক এ অবস্থাটা তার সরকার ধরে রাখতে পেরেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কভিড কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আমদানি-রপ্তানি বেড়েছে। দেশের কাজ বেড়েছে। তা ছাড়া ভ্যাকসিন ক্রয় এবং করোনা মোকাবিলার আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছেথ এগুলোর জন্য টাকা খরচ হয়েছে। পানির মতো টাকা খরচ করতে হয়েছে। তারপর এখন আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে, তার জন্য অধিক দামে আমদানিতে অর্থ ব্যয় হচ্ছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘যতই দাম বাড়ুক সরকার ইউক্রেন-রাশিয়া, কানাডা থেকে এই যুদ্ধকালীন গম কিনে আনছে। এ জন্য ২০০ ডলারের গম ৬০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। ভোজ্য তেল সেই ব্রাজিল থেকে শুরু করে পৃথিবীর যে দেশে পাওয়া যায়, আমরা নিয়ে আসছি। মানুষের ভোগ্যপণ্য প্রাপ্তিতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছি। মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার।’

শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর অনেক দেশের রিজার্ভ কমে গেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার শ্রীলঙ্কাকে কিছু সহযোগিতা করেছে। আরও অনেক দেশ বাংলাদেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। তবে তিনি সেসব দেশের নাম উল্লেখ করেননি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যেটুকু রিজার্ভ, সেটা আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজন, সেটা আমাদের রাখতে হবে।’ তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, রিজার্ভ রাখা লাগে। কেননা যদি কোনো দৈব দুর্বিপাক হয় সে সময় ৩ মাসের খাবার যেন আমদানি করা যায়। আর সে জন্য আমাদের খাদ্যপণ্য যাতে মোটেই আমদানি করতে না হয় তার জন্য তিনি দেশবাসী প্রত্যেককে যার যেখানে এতটুকু জমি আছে তাতে ফসল ফলিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার এই বিশ^মন্দার মাঝেও উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিও রয়েছে। তবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া এবং জনগণের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অন্তত তারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল বলেই জাতির পিতা হত্যার বিচার করতে পেরেছি। কিন্তু এখনো কিছু খুনি রয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুনিদের একজন কানাডায়, একজন আছে আমেরিকায়, আর দুজন পাকিস্তানে। আরেকজনের খবর পাওয়া যাচ্ছে না কখনো ইন্ডিয়াতে, কখনো জার্মানিতে বিভিন্ন জায়গায় মোসলেহ উদ্দিন অবস্থান করেছে। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এদের ধরে আনার।’

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তার সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৩২টি স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত হাসপাতালের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২টি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, সংক্রামক-অসংক্রামক ব্যাধি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ এবং সংরক্ষণ করার জন্য ডিজিটাল ‘হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম’ স্থাপন করেছি, যেন দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দুর্যোগের আগেই প্রেরণ করা যায়।

তিনি বলেন, সরকার ‘মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম চালু করেছেথ এর আওতায় দরিদ্র-হতদরিদ্র মায়েদের প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন এবং প্রসব-পরবর্তী যাবতীয় সেবা, যাতায়াত খরচ এবং পুষ্টিকর খাবারের অর্থ দেওয়া হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছে এবং সিনিয়র স্টাফ নার্সদের ছয় মাসের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা-ইন-মিডওয়াইফারি কোর্স চালু করার পাশাপাশি ৩ হাজার মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি করে মিডওয়াইফদের পদায়ন করেছে।

বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ প্রসবজনিত রক্তক্ষরণ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অক্সিটসিন ইনজেকশন এবং বিনা পয়সায় মিজোপ্রস্টল ট্যাবলেট সরবরাহ করছে। তিনি বলেন, বিশ^খ্যাত ল্যানসেট চিকিৎসা সাময়িকী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অর্জনকে (ডিসেম্বর ২০১৩) ৬টি সিরিজ প্রকাশনার মাধ্যমে এশিয়ার বিস্ময় হিসেবে তুলে ধরেছে। নানাবিধ প্রতিকূলতা এবং অপ্রতুলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অসাধারণ সাফল্য বিশে^ এখন রোলমডেল।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ছিল সরকারি ৫৮৯টি এবং বেসরকারি ২ হাজার ২৭১টি; যা ২০২২ সালে সরকারি ৬৮ হাজার ৩৪৫টি এবং বেসরকারি ১ লাখ ৫ হাজার ১৬৮টিতে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি ডাক্তার ছিল ১২ হাজার ৩৮২ জন; যা ৩০ হাজার ১৫২ জনে উন্নীত করা হয়েছে। নার্সের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৩৭৭ জন; যা ৪৩ হাজার ১৫ জনে উন্নীত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কভিড-১৯ মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, ‘কভিড-১৯ রিকোভারি সূচকে’ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবার ওপরে এবং বিশ্বের যে দেশগুলো সবচেয়ে ভালো করছে সেই তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।

তার সরকার ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ এবং ‘গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা চায়’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে থেকে যেবার শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে সেবারই প্রথম দেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং এই তৃতীয়বারের মতো এখন সরকারে অন্তত এটুকু দাবি করতে পারে যে এই ১৪ বছরে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। আর আমাদের দেশের মানুষেরও অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতার সেই অমোঘ মন্ত্র ‘বাংলাদেশের মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’ উচ্চারণ করে বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ ‘অত্যন্ত উৎসাহী, তাদের একটু সুযোগ দিলে তারা অসাধ্য সাধন করতে পারে।’

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বাচিপের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বক্তৃতা করেন। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক। জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং শান্তির প্রতীক বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি স্বাচিপের স্থায়ী কার্যালয়ের ফলক উন্মোচন করেন। বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত