তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি দেশে আর কোনো নির্বাচন হতে দেবে না বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচন হবে। যত দিন পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকার পদত্যাগ না করবে, তত দিন দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। তারেক রহমানকে ছাড়া এ দেশে নির্বাচন হবে না।’ গতকাল শনিবার বিকেলে কুমিল্লার টাউন হল মাঠে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দলের অষ্টম বিভাগীয় গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব।
বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে গোটা দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই দানবীয় সরকার আমাদের সব অর্জন কেড়ে নিয়েছে। এই সরকার আমাদের ভাতে মারছে, পানিতে মারছে, সকল পর্যায়ে কর্মসংস্থান শেষ করে দিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের যন্ত্রণায় গোটা দেশ আজ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।’
বক্তব্যের শুরুতে মির্জা ফখরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে নিহত ছাত্রদল নেতা রফিকুল ইসলাম নয়ন মিয়াকে স্মরণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ‘পুলিশের হাতে ও আওয়ামী লীগের নির্যাতনে’ নিহত দলের নেতাকর্মীদের স্মরণ করেন। নয়ন মিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নয়নকে বিনা কারণে কুমিল্লা বিভাগীয় গণসমাবেশের লিফলেট বিলি করার সময় হত্যা করা হয়েছে। আজকের সমাবেশে তার (নয়নের) বাবার চোখে যে আগুন দেখতে পেয়েছি, তা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের চোখেও জ্বলছে।’
কুমিল্লাকে গর্বিত ও ঐতিহাসিক জেলা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজ মানুষ মুক্তি চায়, মুক্তির জন্যই আজ এখানে আপনারা সমবেত হয়েছেন। এই জেলায় অনেক কৃতী সন্তান জন্ম নিয়েছেন। বড় বড় রাজনৈতিক নেতা তৈরি হয়েছেন।’
২৫ মিনিটের বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘সরকার বিগত ১৫ বছরে সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে, বিচার ও স্বাস্থ্য বিভাগ ধ্বংস করে দিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ করে দিয়েছে, কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে, প্রশাসন শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দেশ চলতে পারে না। তারা বলে প্রধানমন্ত্রী, আমরা বলি অবৈধ প্রধানমন্ত্রী, জোর করে দুইবার নির্বাচন করেছেন। ২০১৪ সালে কেউ ভোট দিতে যাননি, ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন, আর ২০১৮ সালে তো আগের রাতেই ভোট শেষ।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘উনি নাকি আবার নির্বাচন করবেন, পরশু দিন যশোরে মিটিং করেছেন। সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রের সকল যন্ত্রকে ব্যবহার করে হাজার হাজার বাস-ট্রাক দিয়ে মানুষ নিয়ে যশোরে সভা করেছেন। সেই সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে নাকি জনগণ শান্তি পায়। আপনারা (জনসভায় উপস্থিতরা) কী শান্তিতে আছেন?’
যশোরের জনসভায় আগামী নির্বাচনে নৌকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভোট চাওয়া প্রসঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল। তিনি আব্বাস উদ্দিনের গানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় উঠতাম না, বাংলাদেশের মানুষ এখন এই গান গাইতে শুরু করেছে। ভুলে যান ওই ভাঙা নৌকার কথা। বাংলাদেশের মানুষ এখন আপনাদের বিদায় দেখতে চায়। দয়া করে সময় থাকতে মানে মানে কেটে পরুন, তা না হলে এই দেশের মানুষ আপনাদের বিদায় করবে। কীভাবে করবে সেটা আপনারা জানেন, অতীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে।’
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুর রশীদ ইয়াছিনের সভাপতিত্বে এ গণসমাবেশ হয়। কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ইউসুফ মোল্লা টিপু ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. জসিম উদ্দিন সভা সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন। এতে বক্তব্য দেন বিএনপির জাতীয় ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলু, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ আরও অনেকে।
কানায় কানায় পরিপূর্ণ সমাবেশের মাঠ : এর আগে হওয়া সাতটি গণসমাবেশের মতো কুমিল্লার সমাবেশে অংশ নিতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের পরিবহন ‘ধর্মঘট’ বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়নি। কুমিল্লার এই সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা উত্তর, কুমিল্লা দক্ষিণ এবং মহানগর বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মী এবং সমর্থক মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন। কাকডাকা ভোর থেকেই নগরীর টাউন হল মাঠের দিকে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। সকাল ১০টার মধ্যেই পূবালী চত্বর ও আশপাশের সড়কগুলো নেতাকর্মীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এর আগে গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই সমাবেশস্থলে এসে জায়গা দখলে নেয় কুমিল্লা বিভাগীয় বিএনপির বিভিন্ন সংসদীয় আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অনুসারীরা। গানে গানে আর আনন্দ উল্লাসে মাঠে রাত পার করেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। সমাবেশে নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার সমর্থিত নেতাদের পক্ষে শো-ডাউন করেন কর্মী-সমর্থকরা। সমাবেশ মাঠে বড় ধরনের শো-ডাউন করেন সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার। তিনি নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড থেকে ১০ হাজারের বেশি কর্মী-সমর্থক নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন। তা ছাড়া আরেক বহিষ্কৃত নেতা মনিরুল হক সাক্কুও সস্ত্রীক তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মাঠে শো-ডাউন করেন। মাঠের পূর্ব পাশের একটি অংশে সাক্কু সমর্থকরা জড়ো হন। আর পশ্চিম এবং মধ্য অংশজুড়ে ছিলেন নিজাম উদ্দিন কায়সারের সমর্থকরা। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় জনপ্রিয় এই দুই নেতাই মঞ্চে উঠতে পারেননি।
সমাবেশ শুরুর আগেই ইন্টারনেট সেবা বন্ধ : সমাবেশ শুরুর আগেই আশপাশের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা ইন্টারনেট-সংযোগ ছিল একেবারেই বিচ্ছিন্ন। এতে সমাবেশের প্রতিবেদন পাঠাতে ভোগান্তিতে পড়েন গণমাধ্যমকর্মীরা। তা ছাড়া সমাবেশে আসা বিএনপির নেতাকর্মীরা ইচ্ছে থাকলেও সমাবেশের দৃশ্য ফেইসবুকে লাইভ করতে পারেননি।
খালেদা-তারেকের জন্য ছিল ফাঁকা চেয়ার : সমাবেশের মঞ্চে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য রাখা হয় দুটি খালি চেয়ার। এর আগের বিভাগীয় সমাবেশগুলোতেও তাদের জন্য খালি চেয়ার রাখা হয়েছিল। দুটি চেয়ারেই দলের শীর্ষ এই দুই নেতার ছবি রাখা হয়।
রুমিন ফারহানারসহ চার শতাধিক মোবাইল ফোন চুরি : সমাবেশস্থল থেকে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানার মোবাইল ফোনসহ চারশোর বেশি মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে রুমিন ফারহানা নিজেই তার মোবাইল ফোন খোয়া যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে জনস্রোত দেখতে টাউন হলে আসি। এরপরই আমার মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে যায়।’ রুমিন ফারহানা ছাড়াও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চারশোর বেশি নেতাকর্মীর মোবাইল ফোন চুরি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও দলের পাঁচ নেতাকে ‘গুলি করে হত্যা’র প্রতিবাদে এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি বিভাগীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে গণসমাবেশ করছে। এর আগে গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে প্রথম গণসমাবেশ হয়। পরে ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর ও সিলেটে সমাবেশ হয়। আগামী ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী এবং ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে।
