শূন্যরেখায় খুলল মানবতার দুয়ার

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০২:৪১ এএম

মেহেরপুরের মুজিবনগরের মেয়ে সুকৃতি মন্ডলের ৩৫ বছর আগে বিয়ে হয় ভারতের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুরে। বিয়ের পর সেখানেই স্বামীর পরিবারে বসবাস শুরু হয় তার। সীমান্তে কড়াকড়ি এবং কাঁটাতারের বেড়ার কারণে ২৫ বছরে মা, বাবা, ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা নেই তার। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন ছিল ইন্টারনেট ব্যবহার করে ভিডিও কলে কথা বলা। গত শনিবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নদীয়ার চাপড়া হাসপাতালে মারা যান সুকৃতি।

খবর পেয়ে বাংলাদেশের স্বজনরা তার মরদেহ দেখার জন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে আবেদন করেন। বিজিবিও মানবিক দিক বিবেচনা করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সঙ্গে যোগোযোগ করে। পরে বিএসএফের সম্মতিতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে স্বাধীনতা সড়কের সীমান্ত ১০৫ মেইন পিলারের নোম্যান্সল্যান্ডে মরদেহ দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এদিন বিকেলে বিএসএফের কড়া পাহারায় সুকৃতির মরদেহ আনা হয় সীমান্তে। অন্যদিকে বিজিবির পক্ষ থেকে বাংলাদেশি স্বজনদের নেওয়া হয় মরদেহের কাছে। তাদের আহাজারিতে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অবশ্য শোক ছাপিয়ে সুকৃতিকে শেষবারের মতো দেখতে পেয়ে তার স্বজনরা সন্তুষ্ট। কিছুক্ষণ দেখার পর সুকৃতির মরদেহ আবার ভারতে নিয়ে যায় বিএসএফ।

সুকৃতির মতো বিয়ে বা দেশত্যাগের কারণে এমন বহু পরিবার বিভক্ত হয়ে পড়েছে সীমান্তের এপার বাংলাদেশে কিংবা ওপার ভারতে। শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া হওয়ার কারণে স্বজনদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ দীর্ঘদিন। এত দিন কারও মৃত্যুসংবাদ শুনে কান্না, আহাজারি আর বিলাপ করা ছাড়া শেষবারের মতো মুখখানি দেখারও সুযোগ ছিল না। এখন বিজিবি-বিএসএফ সীমান্তে এমন আহাজারি বন্ধে শূন্যরেখায় উভয় দেশের স্বজনদের মরদেহ দেখার সুযোগ দিতে শুরু করেছে। এতে খুশি উভয় দেশের স্বজনরা। তারা এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে একে সীমান্তে মানবতার দুয়ার খুলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন।

মেহেরপুরের মুজিবনগরের আনন্দবাস গ্রামের উজ্জ্বল শেখের সঙ্গে ভারতের চাপড়া থানার মেয়ে আমিরা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল বহু বছর আগে। ২১ নভেম্বর আমিরা খাতুন ৯০ বছর বয়সে মারা গেলে একইভাবে ভারতে সীমান্তের ওপারে তার স্বজনদের আহাজারি শুরু হয়। সেদিনও স্বজনদের আমিরা খাতুনের মরদেহ দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল বিজিবি-বিএসএফ।

শনিবার সুকৃতি মন্ডলের মরদেহ দেখার পর তার ভাগনে সুহান মন্ডল বলেন, ‘মাসির মরদেহ দেখার সুযোগে অন্য আত্মীয়স্বজনদের সাথেও বহুদিন পর দেখা হলো। মৃত্যু বেদনার সাথে এই সাক্ষাতের আনন্দ অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না।’

এ প্রসঙ্গে মুজিবনগরের বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিবাস্তিন মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুজিবনগর বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার শহিদ শেখ ও বিএসএফের হৃদয়পুর ক্যাম্প কমান্ডার তরুণ কুমার শর্মার উদার মানবিকতার কারণে মৃতের শেষ মুখখানি দেখার সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন দেখা নেই এমন স্বজনদের সাথেও দেখা হচ্ছে। এতে খুশি উভয় দেশের সীমান্তের নাগরিকরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিজিবি-বিএসএফ সীমান্তে মানবতার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তাদের এই উদ্যোগ সীমান্ত নাগরিকদের মনের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে।’

মুজিবনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন বলেন, ‘সীমান্তে স্বজন হারানোর কান্নায় এখন মানবতার দুয়ার খুলে যাচ্ছে, এটা অনেক স্বস্তির। এমন খবর পেলে সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ সবুজ পতাকা তুলে দিচ্ছে। তারা মরদেহসহ উভয় পরিবারের স্বজনদের সীমান্তে আনছে। উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর উপস্থিতিতে মৃতের শেষ মুখখানি দেখানো হচ্ছে। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সীমান্তে মানবতা, সৌহার্দ্য, বন্ধুত্বের নতুন দৃষ্টান্ত শুরু হলো।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত