বন্দরনগরী চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য উর্বর ও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বঙ্গবন্ধুর অতি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী মরহুম এম এ আজিজ ও জহুর আহমেদ চৌধুরীর জন্মস্থান। এখানেই ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানে ১৯৬৬ সালের ৬ দফার পক্ষে জনমত আদায়ে বিশাল জনসভা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠকে বলা যায় লড়াই-সংগ্রামের ঐতিহাসিক সাক্ষী। বঙ্গবন্ধুর আলাদা প্রীতি দেখা গেছে চট্টগ্রাম নিয়ে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায় ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল এ চট্টগ্রামের মুসলিম হলেই। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বাবা-মাসহ সপরিবারে ঘুরতে আসার বহু স্মৃতিও রয়েছে শেখ হাসিনার।
এই চট্টগ্রামেই শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার জন্য হামলা হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বৈরশাসক এরশাদের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বৃষ্টিরমতো গুলি ছোড়ে লালদীঘির মাঠের অনুষ্ঠানে। তৎকালীন শ্রমিক নেতা আবুল কাশেম পুলিশের গুলি তার বুকে নিয়ে সেদিন রক্ষা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে। সেদিন পুলিশের গুলি আরও কেড়ে নিয়েছিল ২৪ নেতাকর্মীর জীবন। পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে পুলিশ হামলা চালায় বঙ্গবন্ধু কন্যার ওপর। শেখ হাসিনা মাইক নিয়ে চিৎকার করে বলেন, গুলি থামাও আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তবুও থামেনি পুলিশের বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়া। এক পর্যায়ে আইনজীবীসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা মানবঢাল তৈরি করে কোর্ট বিল্ডিংয়ে নিয়ে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন।
১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম হামলা হয় তার ওপর। এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ হামলার মতো চট্টগ্রামের হামলাও ছিল ন্যক্কারজনক। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল তার জীবন থামিয়ে দেওয়া এবং রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় করে দেওয়া। তবে থামেননি শেখ হাসিনা। থামেনি তার রাজনীতি। বরং আওয়ামী লীগে ইস্পাত কঠিন ঐক্যের সৃষ্টি করেছেন তিনি।
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারির পুলিশের ওই হামলা স্বচক্ষে দেখেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন। তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের নেতা আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওইদিন পুলিশের হামলায় মনে হয়েছে পৃথিবীতে কেয়ামত নেমে এসেছে। আমিন বলেন, পুলিশের বৃষ্টির মতো ছোড়া গুলি মরহুম শ্রমিক নেতা আবুল কাশেম নিজের বুকে নিয়ে আপাকে (শেখ হাসিনা) রক্ষা করেছেন।
ওই হামলা সামনে থেকে দেখেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির। প্রত্যক্ষদর্শী এই নেতা তখন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, আপাকে (শেখ হাসিনা) নিয়ে বিমানবন্দর থেকে আমরা মিছিলসহকারে আসতে থাকি। আপা তখন ট্রাকে দাঁড়ানো, অন্য নেতাকর্মীসহ। আমরা আপার ট্রাকের পেছনে, মিছিলে। লালদীঘির ময়দানের উদ্দেশে মিছিল যখন নিউমার্কেট হয়ে কোতোয়ালি থানা মোড়ে আসে তখন পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। আমরা ব্যারিকেড অতিক্রম করতে যাব, তখনই বৃষ্টির মতো পুলিশের গুলি। আপাকে রক্ষা করতে গিয়ে আবুল কাশেম মারা যান।
চট্টগ্রামের সাবেক এই মেয়র বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যে কারণে হত্যা করা হয়েছে তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও একই কারণে হত্যা করতে চায় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। শুধু ১৯৮৮ সালেই নয়; নাছির বলেন, চট্টগ্রামে আরও হামলার শিকার হন শেখ হাসিনা। তবুও ছুটে আসেন এখানে।
এ সম্পর্কে আ জ ম নাছির বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনেক স্মৃতি রয়েছে এ শহরে। যে লালদীঘি মাঠ থেকে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার জনসমর্থনের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে জনসভা করেন, ২২ বছরের মাথায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সে মাঠেই ১৯৮৮ সালর ২৪ জানুয়ারি তারই কন্যা তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।
বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম তেজোদীপ্ত করতে চট্টগ্রাম যেতেন আর তার কন্যা শেখ হাসিনাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামবাসীকে জাগিয়ে তুলতে এসেছেন বহুবার। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আজ রবিবারও চট্টগ্রামে আসছেন তিনি। পলোগ্রাউন্ডের জনসভায় লাখো মানুষের সামনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকার পক্ষে ভোট চাইবেন তিনি। টানা ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পক্ষে দেশের জন্য, মানুষের জন্য করা উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরবেন। তার সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও গুজবের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামবাসীকে সেচ্চার হতে, প্রতিবাদ করতে আহ্বান জানাবেন। এত বছর পর রাজনীতির আকাশে আবার যে দুর্যোগের ঘনঘটা শুরু হয়েছে সে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের আওয়ামী লীগকে জাগিয়ে তুলতেই আসছেন প্রধানমন্ত্রী।
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারির পুলিশের হামলা সরাসরি দেখেন এটিএম পেয়ারুল ইসলাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। ওই হামলা সম্পর্কে বলেন, ২১ আগস্টের মতো ভয়াবহ আরেকটি হামলা ছিল সেটি। ২১ আগস্টের হামলায় গোপনে রাষ্ট্রীয় মদদ ছিল। লালদীঘির হামলায় সরাসরি তৎকালীন সরকার জড়িত ছিল। এক পুলিশ সদস্য নেত্রীর (শেখ হাসিনা) দিকে বন্দুক তাক করে। শ্রমিক নেতা আবুল কাশেম সেই গুলি নিজের বুকে নিয়ে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন ওইদিন।
চট্টগ্রামের আজকের জনসভা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়ে আ জ ম নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যে চক্র হত্যা করেছে সেই চক্র এখনো ঘুরঘুর করছে চারদিকে। এই চক্র যতদিন থাকবে শেখ হাসিনা ততদিনই তাদের টার্গেটে থাকবে। সুযোগ পেলেই তারা চেষ্টা করবে শেখ হাসিনাকে থামিয়ে দিতে। তারা জানে, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে পারলে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় নিতে পারবে। আজকের জনসভা ঘিরেও আমরা সতর্ক আছি। যেন আর কখনো এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
নাছির বলেন, চট্টগ্রামে অনেক স্মৃতি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তিনি এই শহরকে, মানুষকে ভালোবাসেন। তাই ক্ষমতায় এসে ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য অনেক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে সাবেক এই মেয়র বলেন, এই শহরের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। তাই অনেকগুলো মেগা প্রকল্প শেষ করা হয়েছে, কিছু শেষ পর্যায়ে।
