পরীক্ষা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের কাছে ভুল বার্তা গেল

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৩৯ এএম

ড. কামরুল হাসান মামুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও গবেষক। সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষা ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে নিয়মিত লিখছেন তিনি। সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলে পাসের হার, জিপিএ ৫ প্রাপ্তির আধিক্যসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ‘করোনা ব্যাচ’ বলে অভিহিত করেছেন কেউ কেউ। ২০২০ সালে নবম শ্রেণিতে লেখাপড়া শুরুর মাত্র আড়াই মাসের মাথায় করোনা মহামারীর কারণে শ্রেণিকক্ষে তাদের সশরীরে ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সালে দশম শ্রেণি শেষ করা পর্যন্ত সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ তারা খুব কমই পেয়েছে। অনলাইন আর অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক লেখাপড়াই ছিল তাদের প্রধান অবলম্বন। তারপরও এবার পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়ার হার বেশির কারণ কী?

ড. কামরুল হাসান মামুন : যদি আমরা বছর হিসেবে পাসের হারের গ্রাফ আঁকি, গ্রাফটা হবে নম্বর অব জিপিএ ৫ এর। প্রথম বছর ২০০১-এ দেখা যাবে ৭৬ জন। তারপরের বছর ৩০০-এর কিছু বেশি, এরকম ভাবে ২০০৮-এ বোধ হয় ৪১ হাজার। এভাবে ২০২২ সালে দুই লাখ ৭০ হাজার। গ্রাফটায় দেখা যাবে প্রচন্ড রেইটে জিপিএ ৫ বাড়ছিল। তো বৃদ্ধির এই হার যদি ঠিক রাখতে হয় তাহলে সংখ্যাটা এরকমই হয়। তারপরও এবারের সংখ্যাটা একটু বেশি মনে হয়। আমার ধারণা করোনাকালে যেহেতু পড়াশোনা হয়নি, সরকার মনে করেছে সবাইকে একটু খুশিটুশি করি। তো সবাইকে খুশি করা তো শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য না। পড়াশোনা তো ভালো হয়নি, তাই ওটা নিয়ে মানুষ যেন খোঁটা না দেয়, তাই একটু সেফ সাইডে থাকার জন্য হয়তো বা ইচ্ছে করেই জিপিএ ৫ একটু বেশি দেওয়া হয়েছে। তবে এ কারণেই যে বেশি হয়েছে তা না। কারণ আমরা তো জানি গত কয়েক বছর ধরেই জিপিএ ৫ বেশি দেওয়ার জন্য স্কুলের শিক্ষকদের চাপ দেওয়া হয়েছে। এমনও হয়েছে বলে আমি শুনেছি যে, ভালো নম্বর না দেওয়া হলে শিক্ষককে শোকজ করা হয়। তো পরীক্ষক যিনি, যিনি মূল্যায়ন করবেন, তাকে যদি এরকম চাপে রাখা হয়, তিনি তো ভাববেন যে আমি কার জন্য সঠিক মূল্যায়ন করব, আমি বরং বেশি নম্বর দিয়ে দেব, যাই লিখুক না কেন আমি পাঁচের মধ্যে পাঁচ দিয়ে দেব, পারলে ছয় দেব! তবে করোনার কারণে কম পড়ানো হলো, তারপরও এত বেশি জিপিএ ৫ পেল, এর মধ্য দিয়ে পরীক্ষা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের কাছে একটা ভুল বার্তা গেল। পড়াশোনা নিয়েও ভুল বার্তা গেল যে, ‘আরে পড়াশোনা কোনো ব্যাপার নাকি! জিপিএ ৫, গোল্ডেন এ... এগুলো কোনো ব্যাপার নাকি! এই যে ব্যাপার না, এটা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনে মারাত্মক একটা খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

দেশ রূপান্তর : প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার পরেই একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়। সেটি হচ্ছে কত শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে আর কত শতাংশ পরীক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছে। এই দুটো মানদন্ড কি আসলেই শিক্ষার কাক্সিক্ষত মানের কথা বলে?

ড. কামরুল হাসান মামুন : পাস আর জিপিএ’র সংখ্যার রেশিওটা আসলে কী? এই যে এবারের পরীক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর ১৫ শতাংশ জিপিএ ৫ পেল, তার মানে বাকি ৮৫ ভাগ যে জিপিএ ৫ পায়নি, আসলে এই ৮৫ ভাগ ফেল করেছে। কারণ এখন এমন ফল দেওয়া হচ্ছে যে, মনে হয় জিপিএ ৫ না পেলে জীবনটা ষোলো আনাই মিছে। জিপিএ ৫ না পেলে বাবা-মাও মুখ লুকান। শিক্ষার্থী, তার বাবা-মা সবাই লজ্জায় কেউ কাউকে ফলের কথা বলেন না। আমরা আসলে রেজাল্টকে তরলীকরণ করতে করতে এমন করেছি যে, ধরেন এক গ্লাস পানির মধ্যে যদি আমি লেবু, চিনি মিশিয়ে একজনের জন্য শরবত বানাই, তারপর গেস্ট বেড়ে গেলে ওই এক গ্লাস শরবতেই অনবরত কেবল পানি মিশিয়ে অতিথিদের শরবত খাওয়ানো শুরু করি... তো এটা এক পর্যায়ে আর শরবত থাকবে না। আমাদের শিক্ষা এবং পরীক্ষার ব্যাপারটাও ওই রকম হয়ে গিয়েছে। পরীক্ষা সম্পর্কে আমাদের ধারণাটাও নাই। পরীক্ষা মানে কী? পরীক্ষা মানে হলো এক ধরনের ফিল্টারিং প্রসেস, চালুনির মতো। অনেক মিশ্রণের থেকে সবচেয়ে ভালো কে, মধ্যম মানের কে, খুব ভালো মানের কে, বেশ ভালো কে কিংবা খারাপ কে... এগুলো যেন আমি আলাদা করতে পারি। এই বিভাজন করতে পারাটা পরীক্ষার একটি মুখ্য উদ্দেশ্য। কেননা, যারা ব্যতিক্রমভাবে ভালো, তাদেরও যদি আমি খারাপদের সঙ্গে মূল্যায়ন করি তাহলে সেই দেশে ব্যতিক্রমী মানুষ তৈরি হবে না। সবার গুরুত্ব একরকম না, ব্যতিক্রমী ভালো খুবই কম এক বা দুই ভাগ। গুরুত্ব কম যাদের তারা না থাকলে আবার গুরুত্ববানেরও মূল্য থাকে না। পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা এই বিভাজনটা পাই। একসময় আমরা যখন পরীক্ষা দিতাম, ২০ জন করে চার বোর্ডে ৮০ জন স্ট্যান্ড করত। তাদের ছবি পত্রিকায় আসত। তাদের বাবা-মায়ের ছবি আসত। তাদের স্কুল ও শিক্ষকদের ছবি আসত। তাদের সাফল্যের গল্প ছাপা হতো। এই ৮০ জন ছাত্রের মধ্যে একটা আত্মসম্মানবোধ তৈরি হতো। এরপরেও ছিল স্টার মার্কস, ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন। বাংলাদেশে এমন অনেক সফল মানুষ আছেন যারা এসএসসি বা এইচএসসি-তে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছেন। গবেষণা করলে দেখা যাবে, আমাদের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সেরা শিক্ষকরা সবাই স্ট্যান্ড করে আসা। তার মানে এই যে ভালো-মন্দের মিশ্রণ থেকে যে আমি সবচেয়ে ভালোগুলো আলাদা করতে পারলাম এটাই তো পরীক্ষার উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যটা এই জিপিএ ৫ এনে, এটাকে তরলীকরণ করা হয়েছে। এই মূল্যায়ন পদ্ধতিকে নষ্ট করে আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিটাকেই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এর অত্যন্ত ক্ষতিকর ফল পাওয়া যাবে আগামী ১০ বছর পরে।  

দেশ রূপান্তর : দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকই নেই। শিক্ষার্থীরা স্বভাবতই এ দুটি বিষয়ের দুর্বলতা নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তর পার করে। অথচ পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারে কোনো এক জাদুর পরশে দেখা যায় এ দুটো বিষয়ে পাসের হার আকাশছোঁয়া। তার মানে কী?

ড. কামরুল হাসান মামুন : এটার মানে হলো, স্কুল এবং স্কুলের শিক্ষকরাও কোনো না কোনোভাবে তাদের শিক্ষার্থীদের বেশি মার্কস পেতে হেল্প করেন। সেটা অসৎ উপায়ে হোক বা যেকোনো প্রকারেই হোক। আবার সরকারও চায় জিপিএ ৫ বেশি পাক, এতে তার সুনাম বাড়বে। মানুষ বলবে এই সরকারের আমলে ছেলেমেয়েরা বেশি করে পাস করছে, বেশি জিপিএ ৫ পাচ্ছে। এর আরও একটা কারণ আছে, আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে অনেকগুলো, তাদেরও তো ছাত্র দরকার। এখন একটা খারাপ ছাত্রও যখন জিপিএ ৫ পেয়ে যায়, যার সত্যিকার অর্থে যোগ্যতা নেই জিপিএ ৫ পাওয়ার, সে তখন তার বাবা-মাকে চাপ দিতে পারে যে, আমি তো এখন ভালো ছাত্র, আমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই! কিন্তু দেখা গেল সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল না, তখন সে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। অর্থাৎ এই রেজাল্ট ভালো করার পেছনে হয়তো এর ভূমিকাও রয়েছে। মানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক তো সব ক্ষমতাবানরাই। তো এরাও হয়তো সরকারকে বেশি করে জিপিএ ৫ এর জন্য চাপ দেয়। জিপিএ ৫ বেশি হলে তাদের ছাত্রসংখ্যাও বেশি হবে।

সত্যি বলতে গেলে আমাদের স্কুল লেভেলে তো ভালো শিক্ষকই নেই। যে মানের শিক্ষক দেওয়ার কথা, শুধু গণিত কেন, বাংলার গুরুত্ব কি নেই? ভাষা তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা ছাড়া আমি তো কমিউনিকেটই করতে পারি না। আমাদের ক্লাস নাইনের এক ছাত্র ও ইউরোপের সমশ্রেণির এক ছাত্রের সঙ্গে মিলালে বোঝা যায় আমরা ভাষাতে কত দুর্বল। আমরা যেদিন থেকে অ, আ, ক, খ পড়ি আমরা তো সেদিন থেকেই এ, বি, সি, ডি’ও পড়ি। কিন্তু দেখা যায়, আমরা একটা লাইনও ইংরেজি বলতে পারি না। কারণ, আমাদের এ বি সি ডির পর আর ইংরেজির শিক্ষক নেই। যে শিক্ষক ইংরেজি পড়ান, তিনি নিজেই ইংরেজি জানেন না। যে শিক্ষক গণিত শেখান, তিনি নিজেই জানেন না গণিত। যিনি বাংলা পড়ান, তিনি জানেন না বাংলা। কারণ আমরা স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের যে বেতন দিই, সেই বেতনে ভালো মানের কোনো শিক্ষক পাওয়া যাবে না। মানসম্পন্ন কেউ ওখানে চাকরি করতে যাবেন না। আর কেউ কেউ গেলেও, এত কম আর খারাপ বেতন দেখে প্রাইভেট পড়ানোর ধান্দাবাজি করতে বাধ্য হবেন। তিনি দেখবেন কীভাবে কোচিং করানো যায়। কয়েকদিন আগে গ্রামে গিয়েছিলাম, সেখানে আমার এক ভাগনির কাছে শুনলাম যে, স্কুলের ক্লাসে তাদের শিক্ষক ঠিকমতো পড়ান না, যাতে তার কাছে প্রাইভেট পড়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। কাজেই, একজন ছাত্র যখন জেনে যায় শিক্ষক ইচ্ছে করে ক্লাসে ভালো করে পড়ান না, তখন শিক্ষকের ওপরই বা কীভাবে তার রেসপেক্ট থাকবে!

দেশ রূপান্তর : প্রশ্নফাঁসের পাশাপাশি আমাদের দেশে প্রশ্ন কমন পড়ানোর মতো একটি পান্ডিত্য জাহির করার চর্চা আছে... দেখা গেছে যে শিক্ষকের যত বেশি প্রশ্ন পরীক্ষায় কমন পড়ে তার তত চাহিদা। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ড. কামরুল হাসান মামুন : ওই যে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের কথা বললাম। এখন, শিক্ষা তো কারোর বাণিজ্যের মুখ্য বিষয় হতে পারে না। রাষ্ট্র শিক্ষককে এমন বেতন দেবে যে তার মধ্যে কোনো লোভ-লালসা থাকবে না। সে একটা আদর্শ, উদাহরণীয় মানুষ হবে। এখন আমরা তো সেভাবে ও সেই ধরনের শিক্ষক নিয়োগ দিই না। এই যে কয়েকদিন আগে ফুটবল বিশ^কাপে জাপানের দর্শকরা খেলা দেখা শেষে স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিষ্কার করে মাঠ ত্যাগ করল, খেলোয়াড়রাও তাদের রেস্টরুম ব্যবহারের পর খেলা শেষে সেটা পরিষ্কার করে বের হলোকেন? কারণ, তাদের প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুলে এমন শিক্ষক দেওয়া হয় যে তারা এইসব নিয়মকানুন, এইসব সততা সেখান থেকে সেই শিক্ষকদের কাছ থেকেই শিখে বের হয়। তারা সেখান থেকেই এভাবে ভাবতে শেখে। আমাদের দেশের মানুষ যে আজ এত অসৎ হয়ে গেছে কেন? কারণ আমাদের শিক্ষক আর শিক্ষাব্যবস্থাটাই তো অসৎ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত