এশিয়ার দ্বিতীয় বিশ্বকাপে এশিয়ার পতাকা উঠে আছে প্রথমদের হাতে। কোন প্রথম? যাদের হাত ধরে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব পেয়েছিল এশিয়া। সেই কোরিয়া-জাপান এই আসরে এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছে শেষ ১৬-তে। অস্ট্রেলিয়া বাদ পড়েছে এই রাউন্ড থেকে। তাই কোরিয়া-জাপানের দিকেই এশিয়ার নজর। আর সব বার না হলেও এবার কেন যেন কোরিয়া-জাপানের অন্য রূপ উঠে এসেছে। হারার আগে না হারা, পিছিয়ে পড়ে ফিরে নাটকীয় ফিরে আসার উদাহরণ রেখে নিজেদের অন্যরকম প্রমাণ করেছে দুই দলই। আজ আবারও সেই প্রমাণ দেওয়ার পালা। ব্রাজিলের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে জাপান শেষ আটে যাওয়ার লড়াইয়ে নামছে। গ্রুপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে জাপান যে কা- ঘটিয়েছে তাতে ব্লু সামুরাইদের নিয়েই এশিয়ার আশা বেশি। আজ আরেকটি চমক উপহার দিয়ে জাপান গতবারের রানার্সআপদের থামায় নাকি ক্রোয়াটরা গতবারের মতোই এগিয়ে চলা অব্যাহত রাখে সেটাই দেখার।
গ্রুপ লড়াইয়ে দুই সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে অন্যরকম ইতিহাস গড়েছে জাপান। প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকেও এক বিশ্বকাপে গত ৫২ বছরে দুই ম্যাচ জেতেনি কোনো দল। সবশেষ ১৯৭০ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি ফিরে আসার এই নজির গড়ে। এর আগে ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল। ওই দুই আসরে জার্মানি ও ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল খেলেছিল। ইতিহাসকে সত্যি করে এত দূর পথ পাড়ি দেওয়াটা পছন্দই করবে জাপান। তার আগে নিজেদের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করতে হবে। চলতি আসরে জাপানের এই অগ্রযাত্রার নায়ক কোচ হাজিমে মোরিয়াসু। দ্বিতীয়ার্ধে চাতুরতার সঙ্গে পরিকল্পনা সাজিয়ে খেলোয়াড় বদল তার দলকে সাফল্য এনে দিয়েছে। এই সময়ে জাপানের চারটি গোলের সবটিই এসেছে বদলি খেলোয়াড়দের কল্যাণে। বিরতির পর যারা মাঠে নেমে তিনটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন।
দুই ম্যাচেই বদলি নেমে গোল করার কৃতিত্ব গড়েছেন রিতসু দোয়ান। মাঠে নামার পর জার্মানির বিপক্ষে মাত্র চার ও স্পেনের বিপক্ষে ২ মিনিট লেগেছে তার গোল করতে। তাই জার্মানির ফ্রেইবুর্গের এ ফরোয়ার্ড হয়ে উঠেছেন জাপানের সুপার সাব। দোয়ান জানালেন এই সুপার সাব হিসেবে খেলাটাই তার পছন্দ হয়ে উঠেছে, ‘স্বাভাবিকভাবে দেখলে মাঠে ১১ বনাম ১১ জনে খেলা হয়। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আমাদের ২৬ জনের সঙ্গে প্রতিপক্ষের ১১ জনের খেলা হয়। এটা আমাদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয় এই জন্য যে আমাদের দলে ২৬ জন আছে যারা যে কোনো সময় ম্যাচ বদলে দিতে পারে। আর বদলি হিসেবে নামতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি পিএসভি এইন্দহোভেনের সময় থেকেই বদলি নামছি এবং জানি কীভাবে প্রস্তুত হয়ে নামতে হয়।’
সাম্প্রতিক ফর্ম ভালো থাকলেও উচ্চাভিলাষী হচ্ছেন না দোয়ান। ক্রোয়েশিয়ার সামর্থ্যকে সম্মান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা জানি ক্রোয়েশিয়া কতটা শক্ত দল। যদি গত বিশ্বকাপে ওদের দিকে তাকাই, তাহলে ওরা দুটি ম্যাচ জিতেছে পেনাল্টিতে একটি অতিরিক্ত সময়ে। তাই ওদের সঙ্গে অনেক শক্তির পরীক্ষা দিতে হবে।’
ক্রোয়েশিয়া এমন অক্লান্ত পরিশ্রমী একজনকে দেখেই - লুকা মদরিচ। ৩৭ বছর বয়সেও ২০১৮’র ব্যালন ডি’অর জয়ী গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের দুটিতে পুরো ৯০ মিনিট খেলেছেন। আর কানাডার সঙ্গে ৪-১ এ জেতা ম্যাচে খেলেছেন ৮৬ মিনিট। গত বিশ্বকাপ রানার্সআপ হওয়া দলের স্বল্প ক’জন এবার ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে আছেন। তার একজন মদরিচ এই বয়সেও মধ্যমাঠের শিল্পীর ভূমিকা পালন করছেন শ্রমিকের মতো। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তরুণদের শেখাচ্ছেন বিশ্বকাপে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ব্যাপক কষ্টের ওই ৯০ মিনিট খেলার পর শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠেই শুয়ে পড়েন মদরিচ। ক্লান্তি কাটছিল না দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত হওয়ার আনন্দ সমর্থকদের সঙ্গে ভাগাভাগির সময়েও। হাঁটুতে হাত দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বারবার।
দলের অধিনায়কের এই ভূমিকা দেখে উদ্বুদ্ধ তরুণ ডিফেন্ডার জোসিপ জুরানোভিচ আরও পরিশ্রম করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ‘আমি বলব আমার রিজার্ভে যথেষ্ট গ্যাস আছে। এতটাই যে পুরো বিশ্বকাপ আমি পরিশ্রম করতে পারব শতভাগ। এটা বিশ্বকাপ। জীবনে হয়তো একবারই এখানে খেলার সুযোগ পাব। আপনার সামনে যখন লুকা মদরিচের মতো একজনকে দৌড়াতে এবং নিজেকে উৎসর্গ করে খেলতে দেখবেন তখন অজুহাত সামনে আনার কোনো প্রশ্নই হয় না।’
বিশ্বকাপে খেলা গত ৫ আসরে দুবার প্রথম পর্বের বৈতরণী পার হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। দুবারই সেমিফাইনাল খেলেছে তারা। ১৯৯৮-তে তৃতীয় আর গতবার দ্বিতীয় (রানর্সআপ) হয়। বিশ্বকাপে তৃতীয়বার গ্রুপের বাধা পেরিয়ে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মদরিচদের। মিডফিল্ডার লভরো মাহের জানালেন সমৃদ্ধ ইতিহাস ধরে রাখার সামর্থ্য তাদের আছে, ‘জয়ের মানসিকতাটা আমাদের রক্তে মেশান। অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়ের যে গ্রুপ আমাদের আছে তারা সব কিছু জিততে প্রস্তুত।’ অবশ্য এতদূর ভাবছেন না মদরিচ। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ তারকা অতীত ভুলে বর্তমানে নজর দিচ্ছেন, ‘২০১৮-তে আমরা যা করেছি তা অতীত এখন আমাদের এই বিশ্বকাপে নজর দিতে হবে। প্রতি বিশ্বকাপ নতুন এবং আমরা কাল (আজ) নতুন ম্যাচে নামতে যাচ্ছি।’
এক দলের পুরনো ইতিহাস ধরে রাখা, আরেক দলের নতুন ইতিহাস গড়া। আজকের ম্যাচে তাই দুই দলের জন্যই চ্যালেঞ্জ জয়ের ইচ্ছেটা তীব্র।
