প্রাণসংহারী হাওয়া, নিঃশ্বাস নেব কোথা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৪২ এএম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ভূলোক’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘পৃথিবীকে ঘিরে আছে যে বাতাস তার শতকরা ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন, ২১ ভাগ অক্সিজেন। আর আর যে-সব গ্যাস আছে সে অতি সামান্য। অক্সিজেন গ্যাস মিশুক গ্যাস, লোহার সঙ্গে মিশে মর্চে ধরায়, অঙ্গারপদার্থের সঙ্গে মিশে আগুন জ্বালায় এমনি করে বায়ুমণ্ডল থেকে নিয়ত তার অনেক খরচ হতে থাকে। এদিকে গাছপালারা বাতাসের অঙ্গারামø গ্যাসের থেকে নিজের প্রয়োজন অঙ্গার আদায় করে নিয়ে অক্সিজেন-ভাগ বাতাসকে ফিরিয়ে দেয়। এ না হলে পৃথিবীর হাওয়া অঙ্গারামø গ্যাসে ভরে যেত, মানুষ পেত না তার নিঃশ্বাসের বায়ু।’ অভিধান বলছে, হাওয়া শব্দটির অর্থ প্রবহমান বায়ু বা তীব্র বাতাস। প্রশ্ন হচ্ছে বায়ুদষণের ফলে প্রাণসংহারী হয়ে ওঠা হাওয়ায় আমরা নিঃশ^াস নেব কোথা! শঙ্কা হয় যে, বেঁচে থাকতে কাঁধে অক্সিজেন সিলিন্ডার আর মুখে গ্যাসমাস্ক নিয়ে ‘সাইফাই’ সিনেমার কোনো ‘ডিসটোপীয়’ দৃশ্য এই ঢাকায় সত্য হয়ে উঠতে পারে। কারণ বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের বার্ষিক প্রতিবেদনে গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রথম দিকে রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর পাঁচটি মহানগরের একটি।

সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘বায়ুদূষণে বছরে মৃত্যু ৮৮ হাজার’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণে বছরে বাংলাদেশের ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। ফলে জিডিপির ক্ষতি হচ্ছে ৩ দশমিক ৯ থেকে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। শ্বাসকষ্ট, কাশি, নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ ও বিষন্নতার ঝুঁকিও বাড়ছে। বায়ুদূষণে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে বলে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্র বা শ্বাসযন্ত্র-সংক্রান্ত রোগের অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বায়ুদূষণ মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। নির্মাণ ও ক্রমাগত ট্রাফিকের জায়গাগুলোতে বিষন্নতা সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, ডব্লিউএইচও নির্দেশিত মাত্রার ওপরে পিএম-২ এক শতাংশ বাড়লে হতাশাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ বাড়ে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় এসবের পাশাপাশি আরও বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে দূষিত বিভাগ ঢাকা এবং সবচেয়ে কম দূষিত সিলেট। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহরের তালিকায় রয়েছে। স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব কমানোর জন্য জনস্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রতিক্রিয়া-প্রক্রিয়ার উন্নতি, বায়ুদূষণের ডেটা মনিটরিং সিস্টেমের উন্নতি, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমে বিনিয়োগ এবং গবেষণা মনযোগ দিতে হবে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) গবেষণায়  দেখা যায়, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ঢাকায় বায়ুদূষণ বেড়েছে গড়ে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। গাড়ির কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ এই দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স মনে করে, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য ও টেকসই করতে বিকেন্দ্রীকরণ, উন্মুক্ত জায়গা দখলমুক্তকরণ, পার্ক বা উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করা দরাকার। এমন উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ বন্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নির্বিকার থাকতে পারেন না। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বায়ুদূষণ বন্ধে কেন জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, বিশ্বে এখন বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎস বা হটস্পট হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়া। আর বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। ওই গবেষণায় বাংলাদেশে বায়ুদূষণের নতুন এক বিপদের কথাও উঠে এসেছে। সেটি হলো ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেড়ে যাওয়া। যেসব এলাকায় জনসংখ্যা ও যানবাহন চলাচল বেশি এবং যেসব এলাকায় বেশি সংখ্যায় উন্নয়ন প্রকল্প চলছে, সেখানেই এই গ্যাস বাড়তে দেখা গেছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সংবাদমাধ্যমগুলোতে বায়ুদূষণ নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর এই সংকট মোকাবিলায় যথাযথ নীতিকৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি।

ইউরোপিয়ান হার্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়, বায়ুদূষণে প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে ৮৮ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বে সারা বছর যুদ্ধ, খুন, যক্ষ্মা, এইচআইভি, এইডস ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যত মানুষ মারা যায়; তার চেয়ে বায়ুদূষণের কারণে বেশি মানুষের প্রাণ যায়। এটা অবশ্যই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণপ্রসূত বায়ুদূষণ আরও তীব্র হবে। বায়ুদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আসন্ন স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় ভালো প্রস্তুতি থাকতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত