নভেম্বর মাসে হঠাৎ করেই বাজার থেকে চিনি উধাও হয়ে যায়। গ্যাস সংকটে সরবরাহ কমে যাওয়ার দোহাই দিয়ে বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে চিনির দাম। অব্যাহতভাবে বেড়েছে চাল, আটা, সয়াবিন তেল, সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম। সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশনও (টিসিবি) জানিয়েছে নভেম্বরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) উল্টো কথা বলছে। খাদ্যপণ্যের দাম কমায় নভেম্বরে খ দ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে দাবি করেছে তারা, যার সঙ্গে বাজারচিত্রের মিল নেই।
গতকাল সোমবার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেন। নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি কমে ৯ শতাংশের নিচে রয়েছে বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তিনি। এ সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত মাসে ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। সবজিসহ নানা খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস।
নভেম্বর মাস শেষে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশে। অক্টোবরে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৯১ শতাংশে। সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৯ দশমিক ১০ ও আগস্টে ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।
বিবিএস সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম কমেছে দাবি করলেও বাজারের চিত্র পুরো উল্টো। টিসিবির এক মাসের হিসাবে প্রতিটি পণ্যের দামই বেড়েছে।
টিসিবির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, অক্টোবরের ৩০ তারিখে মোটা চালের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫৪ টাকা, নভেম্বরের ৩০ তারিখে তা ৫৫ টাকায় দাঁড়ায়। আটার দাম অক্টোবরের শেষে সর্বোচ্চ ৫৮ টাকা থাকলেও নভেম্বরের শেষে ৬৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময় রিফাইন্ড সয়াবিন তেলের দাম ১৬৫ থেকে ১৮০, পামঅয়েল ১২২ থেকে ১৩৫, মোটা ডাল ১২০ থেকে ১৩০, চিনি ১১৫ থেকে ১২০, লবণ ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় দাঁড়ায়।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেশ রূপান্তর দেখতে পেয়েছে, অক্টোবরে যে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৭০ টাকা, নভেম্বরের শেষে তা ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বরে মিনিকেট চাল ৬৫ থেকে ৭৩, প্যাকেট আটা ১১৫ থেকে ১৫০, খোলা আটা ৪৫ থেকে ৬৫, জিরা ৪৪০ থেকে ৫২০, লবঙ্গ ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০, দেশি মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তা ধীরে ধীরে কমছে বলে প্রতি মাসে তথ্য প্রকাশ করছে বিবিএস। গতকাল নভেম্বর মাসে খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে বলে তথ্য প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন মন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে কোন কোন বাজার ঘুরে খাদ্যপণ্যের দাম কমার তালিকা প্রস্তুত হয়েছে তা মন্ত্রীর কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘নভেম্বর মাসে অত্যন্ত ভালো খবর পেয়েছি। মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরে আরও কমার সম্ভাবনা আছে।’ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান, শাকসবজির উৎপাদন হওয়ার পাশাপাশি তেল-গ্যাসের দাম বিশ্বব্যাপী কমায় সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিও ৭ শতাংশে যাবে এমন আশাবাদ পরিকল্পনামন্ত্রীর।
তিনি বলেন, ‘তেল-গ্যাস সরকার নিজে কিনে বিক্রি করে, সরকার মহাজন নয়, এটা নিয়ে লাভ করবে না। বিশ্ববাজারে দাম কমলে সরকার অবশ্যই কমাতে বাধ্য হবে। মূল্যস্ফীতি পরিমাপকের সূচকগুলো পর্যালোচনা করবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এমন কিছু পণ্য যা নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়, তা এ তালিকায় রাখা হবে কি না তা ভাবা হচ্ছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে ৪২২টি পণ্যের ওপর মূল্যস্ফীতি যাচাই করা হয়। এখন সেগুলো আবার পুনর্বিবেচনা করা হবে। কেননা এখানে সোনার দামও ধরা হয়েছে। সোনার দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়ে। এছাড়া মাখন ও কফিসহ এ রকম অনেক পণ্যের দামও ধরা হয়। এগুলো সংশোধন করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনেকে রাজনীতি করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের আশা পূরণ হয়নি। মূল্যস্ফীতি কমার মূল কারণ হচ্ছে ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে কোনো কোনো পণ্যের কর ছাড় এবং টিসিবির পণ্য বিক্রির কারণে মূল্যস্ফীতি কমেছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্তের দিকে আলাদা নজর দিচ্ছে না সরকার। অর্থনৈতিক, মানবিক ও রাজনৈতিক কারণে নিম্নবিত্তের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।’
বিবিএসের হিসাবেই গ্রামের মানুষের সব দিকে অস্বস্তি বাড়ছে। গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ক্রমেই বাড়ছে। নভেম্বরে তা হয়েছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। গ্রামে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি গ্রামে লাগামছাড়া। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭০ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
বিবিএস মূল্যস্ফীতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যে ব্রয়লার মুরগি, ডিম, পাম তেল, সবজি, মসলা, ফল প্রভৃতির মূল্য হিসাব করে। এছাড়া খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ক্ষেত্রে পোশাকাদি ও স্বর্ণালংকারের হিসাব করে থাকে।
নভেম্বরে মজুরি হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। কৃষি খাতে মজুরি হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। শিল্প খাতে মজুরি হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সেবা খাতে মজুরি হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশে।
সূচক নভেম্বর % অক্টোবর %
গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৮৫ ৮.৯১
খাদ্যে গড় ৮.১৪ ৮.৫০
খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ৯.৯৮ ৯.৫৮
গ্রামে গড় ৮.৯৪ ৮.৯২
গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৩ ৮.৩৮
গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ১০.৩১ ৯.৯৮
শহরে গড় ৮.৭০ ৮.৯০
শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৯৫ ৮.৭৫
শহরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ৯.৫৪ ৯.০৭
সূত্র: বিবিএস
খাদ্যপণ্যের বাজার হিসাব
পণ্য নভেম্বর (টাকা) অক্টোবর (টাকা)
মোটা চাল ৫৫ ৫৪
আটা ৬৩ ৫৫
রিফাইন্ড সয়াবিন ১৮০ ১৬৫
পাম অয়েল ১৩৫ ১২২
মোটা ডাল ১৩০ ১২০
চিনি ১২০ ১১৫
লবণ ৪০ ৩৮
সূত্র: টিসিবি
