বহু দেশের, অনেক জাতির মাঝেই প্রচলিত আছে ১৩ সংখ্যাটা ‘অপয়া’। প্রাচীনদের অনেকেই বলেন, আনলাকি থার্টিনে কোনো নতুনের শুরু করতে নেই। সেদিন বিয়ে করতে নেই, ব্যবসা শুরু করতে নেই, এমনকি খুব প্রয়োজন না পড়লে ঘরের বাইর হতে নেই। সেই ১৩, অর্থাৎ আসছে ১৩ ডিসেম্বর যোগসূত্র এবারের বিশ্বকাপেরও। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচ হয়ে যেতে পারে সেমিফাইনাল। সেজন্য আগে মিলতে হবে দুটি ম্যাচের জটিল অঙ্ক। একটিতে আর্জেন্টিনার হারাতে হবে নেদারল্যান্ডসকে। অন্যটিতে ব্রাজিলের জিততে হবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। যদি তাই হয় ১৩ ডিসেম্বর রাতে বিশ্বফুটবল দেখবে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় একটি দলকে বীরের বেশে ফাইনালের মঞ্চে পা রাখতে। আরেক দলের ভাগ্যে জুটবে অপয়া ১৩’র ট্যাগ।
আর্জেন্টিনা আগেই উঠে গেছে কোয়ার্টারে। সোমবার রাতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিল জেতায় শেষ আট ছাপিয়ে সবার ভাবনায় এখন দুই লাতিন পরাশক্তির লড়াইয়ের ভাবনা চলে এসেছে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে, এ নিয়ে প্রশ্ন জেতেই ব্রাজিল স্ট্রাইকার রিচার্লিসন থামিয়ে দিলেন প্রশ্নকর্তাকে। কোরিয়াকে হারানোর পর টটেনহ্যাম তারকা বলেন, ‘আমরা এখন শুধুই ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে ভাবছি। সেমিফাইনাল পরের ধাপ। আগে তো আমাদের কোয়ার্টার ফাইনাল পেরুতে হবে।’
দু’দলের ভাবনায় না থাকলেও শুক্রবারের দুই ম্যাচ ছাপিয়ে ভক্ত-সমর্থকদের কল্পনায় ১৩’র সেই মহালড়াই। যার জন্য তাদের ঠিক ২২ বছরের অপেক্ষা। সেদিন কে কাকে কাঁদাবে, দুর্ভাগ্যের দিনটি কার জন্য উপস্থিত হবে, কার মেনে নিতে হবে বিদায়ের পরিণতি? এসব নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চায়ের কাপে উঠেছে ঝড়। তর্ক-বিতর্কও হচ্ছে সমানে। মিডিয়াও বসে নেই। স্বপ্নের ম্যাচ নিয়ে তারাও ভক্তদের দিচ্ছে জ্বালানি। সামনে নিয়ে বসেছে দু’দলের অতীত লড়াইয়ের পরিসংখ্যান।
প্রাচীন দুটি দল মুখোমুখি হয়েছে সব মিলিয়ে ১০৭ বার। ৪০টি করে জয় আছে দু’দলের নামের পাশে। আর বাকি ২৩টি ম্যাচ ছিল অমীমাংসিত। বিশ্বকাপের মহামঞ্চে দু’দলের দেখা হয়েছে মাত্র চারবার। যার দু’বার জিতেছে ব্রাজিল, একবার আর্জেন্টিনা। অপরটি ড্র। গ্রুপ পর্বে কখনই ব্রাজিলকে হারাতে না পারা আর্জেন্টিনা ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে ১-০ গোলে জিতে ব্রাজিলকে বিদায় করেছিল। সেই ম্যাচটির কথা আজও মনে আছে। ব্রাজিল ইতালিতে এসেছিল অন্যতম ফেভারিট হিসেবে। গ্রুপ পর্বে অসামান্য ফুটবলে সেই সম্ভাবনার পালে জোর হাওয়া লেগেছিল। তবে দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচে এসেই সব খেই হারায়। ম্যারাডোনার অসাধারণ পাস ধরে ক্যানিজিয়ার লক্ষ্যভেদের পর যে উদযাপনটি হয়েছিল, সেটাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা উদযাপন দাবি করে অনেকেই। সেই বিদায় দেওয়ার প্রতিশোধটা নেওয়ার সুযোগ বিশ্বকাপের মঞ্চে পায়নি ব্রাজিল। দু’দলের সর্বশেষ লড়াইয়ে কাঁদতে হয়েছে নেইমারের ব্রাজিলকে। গত বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালে ১-০ গোলে জিতেছিল মেসির আর্জেন্টিনা।
সে রাতে রিওডি জেনিরোর আকাশে উড়েছিল হাজারো সাদা-আকাশি ফানুস। মারাকানা আরেকবার দুঃখ হয়ে ধরা দিয়েছিল ব্রাজিলিয়ানদের কাছে। খুব কেঁদেছিলেন নেইমার। তাকে বুকে জড়িয়ে মেসির সান্ত্বনার ছবিটি ছুঁয়ে গিয়েছিল হাজারো ভক্তের হৃদয়। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের হাতে প্রথম কোনো শিরোপা উঠতে দেখাটাও ছিল বিশাল প্রাপ্তি। সেটাই যে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির প্রথম। মহাদেশ জয়ের পর ক্যারিয়ারের অস্তাচলে দাঁড়িয়ে মেসির মহাবিশ্ব জয়ের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন অবশ্য মøান হয়ে যেতে পারে আসছে সপ্তাহেই, হয় ৯ ডিসেম্বর, নয় তো ১৩ ডিসেম্বর। ৯-এ মেসিকে রিক্ত হাতে বিদায় দিতে ডি ইয়ং, মেমফিস ডিপেইদের লিখতে হবে আরেকটা ডাচ রূপকথা। অন্তত বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্ত সে রাতে নিশ্চয় ডাচদের টোটাল জয়োগান শুনতে চাইবে না। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সে রাতে গত আসরের সেমিফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। ক্রোয়াটরা অতিমানবীয় কিছু করে ফেললে হয়তো সে রাতেই করুণ সমাপ্তি ঘটবে নেইমারদের হেক্সা জয়ের অভিযান। ওরকম অলুক্ষণে কিছু যাতে না ঘটে সেটা নিশ্চিত করা এবং দুনিয়াকে আরেকটি লাতিন সুপারক্লাসিকো সাক্ষী হওয়ার দায়িত্ব দুই মহাতারকার। ইউরোপিয়ান দেয়াল ভাঙতে পিএসজির দুই তারকাকে ফের জ্বলতে হবে, বাকিদের দেখাতে হবে পথ। তবেই শুক্রবার রাতটা হবে মেসি-নেইমারময়। তাতেই ১৩ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচের মহালড়াইয়ের ভাবনায় বুঁদ হবে সারা বিশ্বের সমর্থকরা।
