ক্যাসিনোকান্ডের মামলা নিষ্পত্তি হয়নি এখনো

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:০৮ এএম

আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতি প্রতিরোধ দিবস। প্রায় প্রতিনিয়তই দুর্নীতি দমন কমিশনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ছে। অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ওইসব তদন্তে প্রমাণিত হলে কাউকে কাউকে ধরা হচ্ছে। কিন্তু সমালোচনা আছে যে রাখববোয়ালরা ফসকে যাচ্ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের ধারেকাছেও যেতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে দুদক কর্মকর্তারা এই অভিযোগ মানতে নারাজ।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে দুর্নীতিবাজদের ৬ কোটি ৩৫ লাখ ১৯ হাজার ৭০১ টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এদিকে ১৭টি দেশে ৪১৬টি কোটি টাকার খোঁজ পেয়েছে দুদক। এসব অর্থ ফেরত আনতে নানাভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ সম্প্রতি বলেছেন, ‘দুর্নীতির মাত্রা কিছুটা হলেও কমেছে। তবে জন-আকাক্সক্ষা অনুসারে হয়তো কমেনি। তবে দুর্নীতি দমনে কমিশনের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মোটামুটি প্রশংসিত হচ্ছে। দুদক গত পাঁচ বছরে তদন্তের গুণগত মান বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে।’ তিনি বলেছেন, যারাই দুর্নীতি করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এবারে দুর্নীতিবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব’। প্রতি বছরের মতো এবারও সরকারি-বেসরকারিভাবে জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক বর্ণাঢ্য কর্মসূচি পালন করছে। শুক্রবার সকাল ১০টায় বাংলাদেশ শিল্পকাল একাডেমি জাতীয় নাট্যশালা অডিটরিয়ামে আলোচনা সভা ও মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান করেছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বাণীবদ্ধ ভাষণ দেবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধান বিচারপ্রতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করবেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন বিভিন্ন অভিযোগে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি ১৩৯ কোটি ১৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৫৩ টাকা জরিমানা করেছে। একই সময়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নিম্ন আদালতে দুদকের মোট তিন হাজার ৩৫৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এরমধ্যে দুই হাজার ৯৯৮টি মামলার বিচার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান। হাইকোর্টের আদেশে ৩৬৯টি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে উচ্চ আদালতে দুদক সংক্রান্ত ৬০৯টি রিট, ৭৬১টি ফৌজদারি বিবিধ মামলা, ৯৬৪টি আপিল মামলা ও ৪৮৯টি ফৌজদারি রিভিশন মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। আর উচ্চ আদালত কর্তৃক ৪৩টি মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। জুলাই-অক্টোবর এই চার মাসে ১১২টি মামলা বিচারিক আদালতে রায় হয়েছে। এরমধ্যে সাজা হয়েছে ৭১টি মামলার। মামলার সাজার হার ৬৫ শতাংশ। সাজা হওয়া উল্লেখযোগ্য মামলা হলো  টেকনাফের আলোচিত বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা, তিতাসের উপ-ব্যবস্থাপক এস এম হাফিজুর রহমান, ধারা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের মেজর জেনারেল (অব.) জালাল উদ্দিন আহমেদ ও সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্নেল মো. শহিদ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে মামলা।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর দুদকে সাড়ে ১২ হাজারের ওপর অভিযোগ জমা পড়ে। ২০২০ সালে ১৮ হাজার ৪৮৯টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। ২০২০ সালের তুলনায় বিদায়ী বছরে অভিযোগ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। ২০২১ সালে ৩৩০টি অভিযোগের অনুসন্ধান করে দুদক। এ সময়ে ২৪৪টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ায় দুদক সম্পদের নোটিস জারি করে ১৯৩টি। মানিলন্ডারিং (ব্যাংক, বীমা, অনিষ্পন্ন) অনুসন্ধান ও তদন্তের সংখ্যা ৩৬৩টি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৩১১টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি ২২২টি মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়। চলতি বছরের তুলনায় মামলা ও চার্জশিট বেড়ে যাওয়ার হার যথাক্রমে ২০ ও ৩৪ শতাংশ। চলতি বছর দুদক এফআরটি (মামলা থেকে অব্যাহতি) দিয়েছে ৮০টি। ২০২০ সাল ৫২৩টি অভিযোগ অনুসন্ধান এবং ২৫৯টি মামলা করা হয়। পাশাপাশি ১৬৬টি মামলার চার্জশিট দেয়।

ক্যাসিনো কান্ডে তালিকার ৯০ শতাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে : ২০১৯ সালের ১৮  সেপ্টেম্বর থেকে সারা দেশে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। পাশাপাশি ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী ও বিদেশে অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। প্রাথমিক পর্যায়ে দুই সাংসদসহ ৪৩ জনের তালিকা নিয়ে শুরু হয় অনুসন্ধান। ধীরে ধীরে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। দুই বছর পার হলেও ওই তালিকার ৯০ ভাগের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা বা চার্জশিটের মতো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেনি সংস্থাটি। যদিও ইসমাইল  চৌধুরী সম্রাট ও জিকে শামীমসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা দায়ের করেছে সংস্থাটি। এরমধ্যে ১২ মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রায় ৫৮২ কোটি টাকার সম্পদও জব্দ করেছে দুদক। তাছাড়া ক্যাসিনো অভিযানের ধারাবাহিকতায় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক এমডি আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ ওঠার পর এখন পর্যন্ত তিন দফায় ২৩টি মামলা দায়ের করেছে দুদক।

১৭ দেশে প্রায় ৪১৬ কোটি পাচার : ১৭ দেশে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা পাচারের খোঁজে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। বিভিন্ন মূলধনী যন্ত্রপাতি কিংবা পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল আমদানির আড়ালে এত বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করেছে প্রায় ১৩২টি প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয় থাইল্যান্ড, দুবাই, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, চীন, সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, ভারত, নেদারল্যান্ডস, বুলগেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড ও বেলজিয়ামে। ওই সময় কাস্টম আইনে লাইসেন্স বাতিলসহ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের আলোকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিংবা পাচার করা অর্থ ফেরতের দৃশ্যমান উদ্যোগ আর দেখা যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত