সভা-সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান হাসের

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৩৬ এএম

রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি সভা-সমাবেশের অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন।

পিটার হাস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ঢাকায় নিহত ও আহতদের পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছে। আমরা ঢাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন ও রাজনৈতিক সহিংসতার খবরে উদ্বিগ্ন। আইনের শাসনকে সম্মান জানাতে এবং সহিংসতা, হয়রানি ও ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকতে সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সহিংসতার এই খবরগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত

করতে এবং মতপ্রকাশ, সভা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে আমরা সরকারি কর্র্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করছি।

আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশের কর্মসূচি আছে। এ গণসমাবেশ কোথায় হবে, তা নিয়ে বিতর্ক-আলোচনার মধ্যেই গত মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নয়াপল্টন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে বিএনপির এক কর্মী নিহত হন। আহত হন দলটির অর্ধশত নেতাকর্মী।

সংঘর্ষের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে দলের কেন্দ্রীয় কয়েক নেতাসহ শতাধিক কর্মীকে আটক করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় বিএনপির পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করে তিনটি মামলা দিয়েছে পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এসব আহ্বান জানিয়েছেন।

উদ্বেগের সঙ্গে উদ্যোগও কূটনীতিকদের আগামী সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপে উদ্বিগ্ন বিদেশি কূটনীতিকরা। বিশেষ করে আগামীকাল ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে জনসমাবেশ ঘিরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য-কর্মসূচি নিয়ে চলমান উত্তাপ এবং গত বুধবার সংঘর্ষে বিএনপির একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তারা।

গত বুধবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষের পর যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘসহ অনেকেই বিবৃতি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকায় নিযুক্ত মরক্কোর রাষ্ট্রদূতের বাসায় ২৮ দেশের রাষ্ট্রদূতরা বৈঠক করেছেন। রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গতকাল ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর আগে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু,  অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পশ্চিমা ১৪টি দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপান বিবৃতি দেয়। বিরোধী দলকে মিছিল-মিটিং করতে দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক দিন ধরেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিদেশিরা। আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তারা সরাসরি কোনো নির্দেশনামূলক কথা না বললেও পরোক্ষভাবে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে আসছেন। এরই মধ্যে ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে উত্তাপ ও সহিংসতা তৈরি হয়েছে, সেটিও বিদেশিরা পর্যবেক্ষণ করছেন।

গতকাল ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ফেইসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, ‘ঢাকায় ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা সবাইকে আইনের শাসন এবং সহিংসতা, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন পরিহারের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের নামোল্লেখ করে সেখানে আরও বলা হয়, ‘সহিংসতার ঘটনার তদন্ত এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আয়োজন নিশ্চিত করার জন্য আমরা সরকারকে উৎসাহিত করছি।’

এদিকে চলমান রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে গতকাল বিকেল ৩টায় গুলশানে মরক্কোর রাষ্ট্রদূতের বাসায় বৈঠক করেছেন ২৮টি দেশের রাষ্ট্রদূতরা। এক ঘণ্টার এ বৈঠকে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে ১০ ডিসেম্বর বিএনপির জনসমাবেশ ও দুই দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত দুটি দেশের রাষ্ট্রদূত দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি একটি চা-চক্র ছিল। এ বৈঠক সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি সেখানে ছিলেন না।

মরক্কোর রাষ্ট্রদূতের বাসায় ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণব ভার্মা, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হুইটলি, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রায়ার, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত ইসপেন রিখটার সেভেনডেসন, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মাসদুপে, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নান জিয়াতা, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাতালি চুয়ার্ড, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ড্রা ব্রেগ ভন লিন্ডে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত এসা ইউসুফ ই আল দুহাইলান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলি আল হামোদি, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান, কসোভোর রাষ্ট্রদূত গানার উরায়া, নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি, ভুটানের রাষ্ট্রদূত রিনচেন কুনশালি, ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত পেহম ভিয়েত চেইন, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত পাক সং ইউপ, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি জায় কুনও এতে যোগ দেন।

এ ছাড়া ইরানের রাষ্ট্রদূত মানসোলর চেভোসি, ইরাকের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আবদুস সালাম, মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিরুজিমাথ সামির, ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত হারটেন্তো সুবোলো, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ম্যাকোদি সুমতমোর, ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত মারিনকো অ্যান্তোলোভিক, লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদুল মুতালিব এসএম সুলায়মান, মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ বিন্তি মোহাম্মদ হাশিম ও সিঙ্গাপুরের অনারারি কনসাল শিলা পিল্লাই কুলাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

১৪ পশ্চিমা দেশের বিবৃতি : ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে দেওয়া ১৪ পশ্চিমা দেশের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে আমরা মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়ন উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের মৌলিক ভূমিকাকে তুলে ধরতে চাই। আমরা মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে সংরক্ষিত স্বাধীনতা উদযাপন করি এবং ঘোষণাপত্রে বর্ণিত বিভিন্ন অঙ্গীকারের মধ্যে স্বাধীন মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও নির্বাচন বিষয়ে জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরি।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ, সমতা, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অনুসরণীয় মূল্যবোধ ও নীতি হিসেবে আমরা গণতান্ত্রিক শাসনকে সমর্থন ও উৎসাহিত করি। বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে আমরা বাংলাদেশের সাফল্যকে আরও উৎসাহিত করতে আগ্রহী। আমরা মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছি।’

বিবৃতি দেওয়া মিশনগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশন, ব্রিটিশ হাইকমিশন, কানাডিয়ান হাইকমিশন, ডেনমার্ক দূতাবাস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশন, ফরাসি দূতাবাস, জার্মান দূতাবাস, ইতালির দূতাবাস, নেদারল্যান্ডসের দূতাবাস, নরওয়ের দূতাবাস, স্পেনের দূতাবাস, সুইডিশ দূতাবাস, সুইজারল্যান্ডের দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত