উপকারে আসছে না ভুল জায়গার ঘর

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:১৩ এএম

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ছেড়ে যাচ্ছেন সুবিধাভোগীরা। আওনা ইউনিয়নের দুর্গম ঘুইঞ্চারচরে গড়ে তোলা হয়েছে ঘরগুলো। ঘর নির্মাণ, উদ্বোধন ও হস্তান্তর হলেও এখনো দলিল হস্তান্তর হয়নি। কাগজে-কলমে দলিল হস্তান্তর দেখানো হয়েছে মাত্র। কিন্তু দুর্গম এ চরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ও উপার্জনের সুযোগ না থাকায় এরই মধ্যে অনেকেই ঘর ছেড়ে চলে গেছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য ভুল জায়গা নির্ধারণ করেছেন বলে মনে করেন ঘরগুলো বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আশ্রয়ণ প্রকল্পের (ফেস-২) অধীনে সরিষাবাড়ীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি ঘর নির্মাণ ব্যয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা হিসেবে ২৯৫টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রতিটি ঘর নির্মাণ ব্যয় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা হিসেবে ২৫টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিটি ঘর নির্মাণ ব্যয় ২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা হিসেবে তিনটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ উপজেলায় ৩২৩টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৪৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর দুর্গম ঘুইঞ্চারচরে ১৪৬টি ঘর নির্মাণ করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুটি নদী পার হয়ে, ক্ষেতের সরু আইল দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে ঘুইঞ্চারচর আশ্রয়ণ প্রকল্পে যেতে হয়। এ অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, এমনকি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘরের সামনে আগাছায় ভরে গেছে। এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১৪৬টি পরিবার বসবাস করার কথা থাকলেও বর্তমানে বসবাস করছে মাত্র ১৫-১৬টি উপকারভোগী পরিবার। বাদবাকি অনেক ঘরে তালা ঝুলছে। কয়েকটি ঘরের দেয়ালে এরই মধ্যে ফাটল ধরেছে। কোনো ঘরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার লেখা সাইনবোর্ড টানানো হয়নি। ঘর ছেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ বিলের কপি ঘরের দরজার ফাঁকে পড়ে রয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পটির ফাঁকা ঘরে কৃষকরা বিশ্রাম নেন ও গরু-ছাগল বেঁধে রাখেন। ঘরগুলো বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা বলছেন, প্রভাবশালী চক্রের পছন্দমতো জায়গা নির্বাচন এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের কোটি টাকার এ প্রকল্প। অন্যদিকে ক্ষুণœ করা হয়েছে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

ঘুইঞ্চারচর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ পাওয়া হানিফ দেওয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক বছর আগে বউয়ের নামে একটা ঘর পাইছি। এখনো দলিল দেয়নি। এমন জায়গায় ঘর দিছে রাস্তাঘাট, হাটবাজার কোনো কিছুই নেই। নামেই সরকারি ঘর। এক বছর না যেতেই ফেটে যাচ্ছে। এ ঘর নিয়েও বিপদে পড়ছি।’

ঘুইঞ্চারচর আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী শাহীনুর বেগম এসেছেন উপজেলার দৌলতপুর এলাকা থেকে। তিনি বলেন, ‘সরকার অনেক টাকা খরচ করে ঘর করে দিছে। কিন্তু এখানে কোনো কাজকাম করার উপায় নেই। আয়-উপার্জন না থাকলে সংসার চলব কীভাবে, খাব কী? তাই একে একে সবাই চলে যাচ্ছে।’

সত্তরোর্ধ্ব মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘সরকারি ঘর পাইয়া তারাকান্দি থেকে বড় আশা নিয়ে আসছি। এখানে ছাগল-গরু পর্যন্ত পালন করার পরিবেশ নেই। রাস্তাঘাট না থাকায় ব্যবসাবাণিজ্য করার সুযোগ নেই। বড় কষ্টে জীবন কাটাতে হচ্ছে।’

শিক্ষার্থী শাকিল মিয়া জানায়, হেঁটে ৫-৬ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে দৌলতপুর মাদ্রাসায় যেতে হয়। আশপাশে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। মাদ্রাসা দূরে হওয়ায় যেতে অনেক কষ্ট হয়। যে কারণে প্রায় সময় মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থাকে বলেও জানায় সে।

প্রকল্পের জায়গা নির্ধারণের আগে স্থানীয়দের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি বলে জানান আওনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা বেলাল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘরগুলো নির্মাণের আগে কারও কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। স্থানীয় এমপি মুরাদ হাসান, ইউএনও শিহাব উদ্দিন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছেন।’

প্রায় একই ধরনের তথ্য দেন সরিষাবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন পাঠান। তিনি বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকল্পের কাজ করেছেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। দুর্গম চরে আশ্রয়ণ প্রকল্প করার আগে কোনো পরামর্শ করেনি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়ে আমি অবগত নই।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপমা ফারিসা বলেন, ‘আমি যোগদানের আগে আশ্রয়ণ প্রকল্প করা হয়েছে। যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণকাজ চলছে। নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত