এই এক ওলট-পালটের রাত। এ রাতে পাঁচবারের বিশ্বসেরা ব্রাজিলকে টাইব্রেকারে হেরে মেনে নিতে হয় বিদায়ের পরিণতি। আবার এ রাতেই টাইব্রেকার ভাগ্য নিজেদের করে আর্জেন্টিনা পা রাখে সেমিফাইনালে। অথচ এ রাতটা হতে পারত লিওনেল মেসির। আবার তাকে ম্লান করে রাতটা নিজের করে নিতে পারতেন নেদারল্যান্ডসের বদলি স্ট্রাইকার ওউট ওয়েগহার্স্টও। তবে সবাইকে ছাপিয়ে এ ম্যাচের নায়ক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। আর্জেন্টিনার গোলকিপার সব আলো কেড়ে নিয়েছেন টাইব্রেকারে ডাচদের প্রথম দুটি শট রুখে দিয়ে। ২-২-এ অমীমাংসিত ম্যাচটা আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে জিতে চলে গেছে ফাইনালের আরও কাছাকাছি। ১৩ ডিসেম্বর ব্রাজিলকে কাঁদানো ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামে গতবারের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া রূপকথা জন্ম দেয় হট ফেভারিট ব্রাজিলকে হারিয়ে। আর লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডসও সে পথেই হাঁটছিল। একটা সময় মেসির বিদায়ও নেইমারের মতো শূন্যহাতে হওয়ার শঙ্কা চেপে ধরেছিল আর্জেন্টাইন শিবিরে। তবে ভাগ্য এবার আর মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। গত দেড় দশক বিশ্ব ফুটবলকে দুই হাত ভরে দেওয়া মেসিকে যেন নিয়তি কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছে এই ওলট-পালট রাতে।
ব্রাজিলিয়ানদের সব হারানোর রাতে মেসি ঠিকই খেলেছেন ভয়ংকর সুন্দর ফুটবল। প্রথমে সতীর্থ নাহুয়েল মলিনাকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। এরপর পেনাল্টি থেকে ব্যবধান বাড়িয়েছেন। তারপর তার বিশ্বকাপ স্বপ্নে বড়সড় ধাক্কা দিতে দৃশ্যপটে হাজির হন ডাচ বদলি স্ট্রাইকার ওয়েগহার্স্ট। ৭৮ মিনিটে মেম্পিস ডিপের জায়গায় নেমে ৮৩ মিনিটে করেন প্রথম গোল। আর ১০ মিনিটের যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে ডাচদের কৌশলী ফ্রি-কিক কাজে লাগিয়ে ম্যাচটা নিয়ে যান ৩০ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে। নতুন জীবন পেয়ে ডাচরা মনোযোগী হয় নিজেদের দুর্গ সামলাতে। আর আর্জেন্টিনা মরিয়া আক্রমণ চালায় যাতে কোনোভাবেই ম্যাচটা টাইব্রেকারের অনিশ্চয়তায় না যায়। তবে এই ৩০ মিনিট ভাগ্য সহায় হয়নি আলবিসেলেস্তেদের। হয়তো মেসি, ওয়েগহার্স্টকে ছাপিয়ে এমি মার্তিনেজকে জয়ের নায়ক বানাতেই ঈশ্বর এভাবে লিখেছিলেন চিত্রনাট্য। ভাগ্য পরীক্ষায় শুরুতেই ভার্জিল ফন ডাইক ও স্টিভেন বার্গউইনের শট রুখে দেন গত বছর কোপার সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে কলম্বিয়ার তিনটি শট রুখে দেওয়া মার্তিনেজ। ওদিকে আর্জেন্টিনার হয়ে ঠিকই লক্ষ্যভেদ করেন মেসি ও পারেদেস। ২-০ লিডটা একটা সময় ৩-২ হয় আর্জেন্টিনার হয়ে গনজালো মনতিয়েল ও নেদারল্যান্ডসের টিউন কোপমেইনার্স ও ওয়েগহার্স্ট গোল করায়। আর্জেন্টিনার হয়ে চতুর্থ শট নিতে আসা এনজো ফার্নান্দেজের শট পোস্টের বাইরে গেলে এবং লুক ডি ইয়ং গোল করলে ফের হারের শঙ্কা জাগে আর্জেন্টাইনদের। তবে লাউতারো মার্তিনেজ ঠিকই লক্ষ্যভেদ করে দলকে নিয়ে যান শেষ চারে।
এর আগে চিরবৈরী ব্রাজিলের বিদায়ের খবরটা শুনে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। ক্রোয়েশিয়ার কাছে লাতিন শত্রুদের হারে লুসাইল স্টেডিয়ামে মহারণের আগে উপস্থিত আর্জেন্টাইন সমর্থকরা উল্লাসে মাতলেও একটা চাপা আতঙ্ক ঠিকই ছিল ভেতর ভেতর। তাদের পরিণতিও যদি ব্রাজিলের মতোই হয়? হতেও পারত। তবে স্নায়ুর লড়াইটা জিতে ডাচদের আরেকবার হতাশায় ডুবিয়েছে মেসির আর্জেন্টিনা।
ক্রোয়েশিয়ার কাছে ব্রাজিলের হারের ভীতিটা তাড়াতে লুসাইলে সবার দৃষ্টি ছিল একজনের দিকে। আর্জেন্টাইন কোচ জানতেন ডাচরা মেসির খেলাটা সহজ হতে দেবে না। তাই ৫-৩-২ ফরমেশনে একাদশ সাজিয়ে কিছুটা ভড়কে দিতে চেয়েছিলেন। সেটা কাজেও লেগেছে দারুণভাবে। মেসিকে আটকে রাখার সুযোগ ডাচদের রক্ষণ আলগা হবে। সেটা কাজে লাগাতে দুই ফুলব্যাক বারবার যোগ দেবে আক্রমণে। আর এ মেসিকে সহজে আটকে রাখা যায়? ডাচরা ম্যাচের আগে যতই হম্বিতম্বি করুক। মেসিকে রোখা যায়নি। ৩৫ মিনিটে তার ডিফেন্সচেরা পাসকে গোলে পরিণত করেন নাহুয়েল মলিনা। এরপর ৭৩ মিনিটে আকুনাকে বক্সের ভেতরে ফেলে দিয়ে পেনাল্টি উপহার দেন ডাচ ডিফেন্ডার ডামফ্রিস। যা থেকে বিশ্বকাপে নিজের দশম গোল করেন মেসি। বাকি কাজটা ছিল আর্জেন্টাইন রক্ষণের। সেটা পুরোপুরি করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। যার সুযোগ নিয়ে অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে গেছেন ওয়েগহার্স্ট। ম্যাচের ৭৮ মিনিটে যখন দল ২-০ গোলে পিছিয়ে, তখনই নিভে থাকা ডিপেকে তুলে নিয়ে ওয়েগহার্স্টকে মাঠে পাঠিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডস কোচ লুই ফন গাল। এ পরিবর্তনটাই তাদের ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছিল।
তবে এ রাতটা শতভাগ লাতিন ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি বলেই বিশ্বকাপের আবেদনটা অটুট থাকছে। আর সেটা মেসির স্বপ্নটা বেঁচে আছে বলেই।
