রোপওয়ে না হওয়ায় থমকে গেছে উন্নয়ন

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:৩৭ এএম

বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কারখানার বয়স ৮৫ বছরেরও বেশি। পুরনো এই কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২০১৯ সালে ৮৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। তবে কাঁচামাল আমদানিতে রোপওয়ে স্থাপনে ভারতের অনুমোদন না পাওয়ায় থমকে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সিমেন্ট কোম্পানির উন্নয়ন কাজ। এতে বিপাকে সিমেন্ট কারখানাটি।

পুরনো এই কারখানাটির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৫০০ টন থেকে ২০০ টনে নেমে আসায় সরকার ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। এটির কাজ পায় চীনের ঠিকাদারি কোম্পানি নাং জি সি হোপ। তারা ২০১৯ থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের কাজ শুরু করে। নতুন প্ল্যান্ট চালু হলে প্রতিদিন দেড় হাজার টন ক্লিংকার ও ৫০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন আনার জন্য ‘ছাতক সিমেন্ট কারখানা লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেস এ রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর এর অনুমোদন দেয় একনেক। ২০১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রশাসনিক অনুমোদন জারি করা হয়।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্যমান পুরনো ও অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনক্ষম ওয়েট প্রসেস পদ্ধতির পরিবর্তে ড্রাই প্রসেসের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ টন (বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন) উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন কারখানা স্থাপন করা। নির্মাণাধীন এই মূল প্ল্যান্টের চুনাপাথর আমদানির জন্য দৈনিক আড়াই হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ১৭ কিলোমিটারের রোপওয়ে স্থাপন করতে হবে, যেটি মেঘালয় থেকে ছাতক কারখানা পর্যন্ত স্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার শুরুতে স্থানীয় উত্তোলন কেন্দ্র থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করলেও পরবর্তী সময়ে কাঁচামাল আমদানিতে ভারতের মেঘালয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কোম্পানিটি। চুনাপাথর আমদানি ও পরিবহনের জন্য ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কমোররা লেমিসটোন মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (কেএলএমসি) সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি করে ছাতক সিমেন্ট, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩৩ সালে। কিন্তু নির্মাণাধীন মূল প্ল্যান্টের জন্য চুনাপাথর আমদানি ও পরিবহনে ভারতীয় অংশে নতুন রোপওয়ে স্থাপনের জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তাই কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে আর্থিক অগ্রগতি আরও কম। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪৮৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা মোট অনুমোদিত ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। করোনা মহামারীর ধাক্কা এবং ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

এ পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধন করা হবে ‘ছাতক সিমেন্ট কারখানা লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেস-এ রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পটি। গত ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির স্টিয়ারিং কমিটির সভা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সভায় জানানো হয়, নির্মাণাধীন মূল প্ল্যান্টের জন্য চুনাপাথর আমদানি ও পরিবহনের জন্য ভারতের মেঘালয় অংশে নতুন রোপওয়ে স্থাপনের জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তাই কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া চুনাপাথর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেএলএমসি এখন পর্যন্ত মাইনিং করার পূর্ণাঙ্গ অনুমতি পায়নি। এরমধ্যে মাইনিং শুরু করার জন্য সরদার সোহবার কেএলএমসিকে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। কাশি অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট  কাউন্সিল অফিস (কেএইচএডিসি) নন ফরেস্ট জোনে মাইনিংয়ের বিষয়ে কেএলএমসিকে এনওসি দিয়েছে। মাইনিং প্রক্রিয়া শুরু করার পরবর্তী ধাপের কাজ চলমান আছে। এ বিষয়ে শিগগিরই অনুমোদন পাবে বলে আশা করা যায়।

সভায় বলা হয়, সাধারণ ঠিকাদারের মাধ্যমে ভারতীয় অংশে রোপওয়ে মেরামত বা প্রতিস্থাপন কাজ দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। এই কাজ করার আগে ভারতের মেঘালয় রাজ্য সরকারের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। এজন্য গত ১০ নভেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুনরায় অনুরোধ করা হয়েছে। ভারতীয় অংশে মেরামতের অনুমতিতে বিলম্ব ঘটলে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেরি হবে।

সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) মো. নূরুল আমিন জানান, করোনা মহামারীর কারণে ঠিকাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।

স্টিয়ারিং কমিটির সভায় প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘প্রকল্পের এলএসটিকে অংশের ইকুইপমেন্ট বা মালামাল সংগ্রহের বাস্তব অগ্রগতি ৮৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এছাড়া প্রকল্পের এলএসটিকে অংশের সিভিল কনস্ট্রাকশন কাজের বাসভবনের অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এছাড়া এলএসটিকে অংশের ইরেকশন ও ইনস্টলেশন কাজের বাস্তব অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য অংশের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বর্তমানে অস্বাভাবিকভাবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। আরডিপিপি অনুমোদনের সময় প্ল্যানিং কমিশনের ২০১৮ সালের ৭ মার্চ সার্কুলার অনুযায়ী ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা, যা বর্তমানে ১০৭ টাকার ওপরে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্যাস লাইন সংশোধন ও রোপওয়ে নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। গ্যাস সংযোগ এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে ডিপিপি দ্বিতীয় সংশোধন প্রয়োজন হবে। জিজিটিডিসিএল থেকে গ্যাস লাইনের পূর্ণাঙ্গ প্রাক্কলন ও ডিজাইন পাওয়ার দ্রুততার সঙ্গে ডিপিপি সংশোধন প্রস্তাব করা হবে।’

এ পর্যায়ে আইএমইডির প্রতিনিধি বলেন, ‘ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনা করে প্রকল্পের সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব দ্রুত পাঠানো উচিত।’

সভার সভাপতি শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘দ্রুত জিজিটিডিসিএল থেকে গ্যাস লাইনের পূর্ণাঙ্গ প্রাক্কলন করে এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি বিবেচনা করে ডিসেম্বরের মধ্যে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধন প্রস্তাব করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত