এই ব্রাজিলিয়ান দল আমাকে হতাশ করেছে

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৪৮ এএম

২০০২ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর ব্রাজিল কখনই ইউরোপের কোনো দলকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে হারাতে পারেনি। কোনো রকম সৃষ্টিশীলতা ছাড়া যখন কোনো টেকনিক্যাল সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় আর সামনে থাকে অনড় এক প্রতিপক্ষ যারা ১২০ মিনিট ধরে একই রকম ভাবে রক্ষণ আগলে থাকতে পারে, তখন তিতের ব্রাজিল দলকে বিদায় নিতেই হলো। ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরে শেষ হলো ব্রাজিলের কাতার বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপটা আমাকে ১৯৮২ সালের আসরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেবারও ব্রাজিল দলে দারুণ সব খেলোয়াড় ছিল আর বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ফেভারিট ভাবা হচ্ছিল কিন্তু ব্রাজিলকে ফিরতে হয়েছিল খালি হাতেই।

ব্রাজিল অনেক আত্মবিশ্বাস নিয়েই কাতারে এসেছিল। তারা ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার, দলে দারুণ দারুণ সব প্রতিভাবান খেলোয়াড়, প্রায় সবাই শারীরিক ভাবে ফিট আর জেতার জন্য মরিয়া। সবাই তাদের ক্লাব ফুটবলের মৌসুমের মাঝপথেই বিশ্বকাপে এসেছিল।  গ্রুপ পর্ব এবং শেষ ষোলোতে একদমই একপেশে জয়ের পর নেইমারকেও ফিরে পাওয়া গেল দলে। জানাই ছিল প্রতিপক্ষ হবে ভালো একটা দল, যারা চোখধাঁধানো ফুটবল না খেললেও কার্যকর ফুটবল খেলে। এটাই হয়তো দলের সবাই মাথার ভেতরে নেয়নি। ৯০ মিনিটের খেলায় যদি কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা হয়, তাহলে কী করতে হবে এটা তাদের জানা ছিল না। সেই সঙ্গে চোট সমস্যা, বারবার একাদশে বদল, এর বদলে ওকে নামানো আর চূড়ান্তভাবে টেকনিক্যাল ভুল এবং দুর্ভাগ্য ব্রাজিলের এই বিদায়ের জন্য দায়ী। দক্ষিণ কোরিয়াকে হারাবার পর যে ছন্দটা খুঁজে পেয়েছিল ব্রাজিল, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই ছন্দটা তারা খুঁজে পায়নি। খুব কষ্ট হয়েছে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে।

আমরা সবাই তিতের কৌশলের প্রশংসা করেছি। খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেওয়া, সবাইকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলানো এসবে খানিকটা প্রশ্ন উঠল সবই ছিল নিখুঁত। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই ছন্দময় ফুটবলটা দেখা যায়নি। প্রথমার্ধটা ছিল ফলহীন, কোনো রকম স্কোরিং পজিশনেই কেউ যেতে পারেনি। লুকাস পাকেতাকে আমার কাছে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেই বেশি কার্যকর মনে হয়। ও যখন কোনো পাস ধরে, ও কেমন করে যেন ওর পিঠ থাকে আক্রমণভাগের দিকে। যে কারণে ও সবসময় ভুল খেলোয়াড়টির কাছে বল পাঠায়।

নেইমার খেলছিল তিন স্কোরারের মাঝের জায়গাটায়, সে নিজের জায়গা বদলের কোনো ইচ্ছাও প্রকাশ করেনি। ভিনিসিয়ুস বাম প্রান্ত দিয়ে চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো সহায়তা পায়নি। শেষ পর্যন্ত রাফিনহা কিছুই করতে পারেনি। রিচার্লিসনকে তুলে নেওয়ার পর পেদ্রোকে নিয়ে খেলতে দলের কষ্ট হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শেষ সময়ে নেইমারের অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যে যে গোলটা পেল ব্রাজিল, সেটা কী করে ধরে রাখতে হবে এই নিয়ে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তারা তাদের খেলায় পরিবর্তন আনেনি, রক্ষণ আরও জমাট করেনি। এই সময়ে বলের দখল নিজেদের কাছে রাখা দরকার ছিল, সেই সঙ্গে পাস দেওয়ার বেলায় আরও সাবধানী। কিন্তু এই ব্রাজিলিয়ান দল আমাকে হতাশ করেছে।

সবার চোখ ছিল কাসেমিরো আর তার রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সতীর্থ লুকা মদ্রিচের দিকে। ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের প্রধান খেলোয়াড় ব্রাজিলের মাঝমাঠের প্রধান খেলোয়াড়কে ছাপিয়ে গেছে। মদ্রিচ ঠান্ডা মাথায় মাঝমাঠের একটা বড় অংশ নিজেদের দখলে রেখেছে। পুরো মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার পায়ে, সেই ছিল সূত্রধর। সেন্টারব্যাকরাও কাজ করেছে মদ্রিচের ইশারাতেই।

ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা ব্রাজিলের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের নিজেদের জায়গায় ঢুকতেই দেয়নি। তার ওপর গোলবারে ছিল লিভাকোভিচ। লুকা মদ্রিচ পেনাল্টি শটটাও দারুণভাবে নিয়েছে। এখন তার নজর সেমিফাইনালের অন্য প্রতিপক্ষের দিকে।

আমি আবারও বলি, ব্রাজিল এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট ছিল। দলের কোচ ছিলেন তিতের মতো অভিজ্ঞ একজন, দলে অনেকগুলো প্রতিভাবান খেলোয়াড় ছিল। তারা গ্রুপ পর্বে আর রাউন্ড অব সিক্সটিনে ভালো খেলেছে, স্রেফ একটা দিন তারা ভুল করেছে। তাতেই তারা ছিটকে গেছে। তারা ম্যাচে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে, গোলের শটে নিশানায় ভুল করেছে, রক্ষণ করে লিড ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং চূড়ান্ত ভাবে স্পটকিক মিস করেছে। এখন ব্রাজিলের আবারও চার বছরের অপেক্ষা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত