গতকাল শনিবার বেলা ১টা। রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্তত ১৫ জন পুলিশ সদস্য। এ সময় রবিন নামে এক যুবক হেঁটে নাবিস্কো মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে আটকে গন্তব্য কোথায় ও যাওয়ার কারণ জানতে চান। উত্তর দিয়ে চলে যেতে চাইলে রবিনকে আটকে তার মোবাইল ফোন দেখতে চাওয়া হয়। কিন্তু তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত বিষয় আপনাদের দেখাব কেন?’ পুলিশ সদস্যরা তখন অনেকটা জোর করেই রবিনের মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিয়ে মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও আদান-প্রদান করা বার্তা ঘেঁটে দেখতে থাকে। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে রবিন বলেন, ‘মোবাইলটি রেখে দেন। আমি চললাম। যা করার খুশি আপনারা করেন। আমি তো চোর না! অপরাধীদের যেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, আমাকে সেভাবেই করলেন।’ এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরা দুঃখ প্রকাশ করে তার মোবাইল ফোনটি ফিরিয়ে দেন।
এর আগে গতকাল বেলা ১১টার দিকে উত্তরার আজমপুরে তল্লাশির নামে প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হন সজীব নামে এক ব্যক্তি। তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে শরীর তল্লাশির পর অনেকটা জোর করেই মোবাইল ফোন নিয়ে ঘেঁটে দেখেন পুলিশ সদস্যরা। পরে বিরক্তি প্রকাশ করে সেখান থেকে চলে যান সজীব।
এই দুজনের মতোই গতকাল রাজধানীতে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ ঘিরে নিরাপত্তার বাড়াবাড়িতে পথে পথে অনেকেই পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যাদের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে পথচারীদের তল্লাশি করা হয়েছে। ইচ্ছে করে কাউকে হয়রানি করা হয়নি।
আর শুধু ঢাকাতেই নয়, রাজধানীর প্রবেশমুখগুলো এবং আশপাশের জেলাগুলোতেও সড়কে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও পথচারীরা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জরুরি কাজে ঢাকায় ঢোকার সময় প্রবেশমুখ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে কাউকে কাউকে।
বিএনপির সমাবেশ সামনে রেখে গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট পরে অবস্থান নেয়। সমাবেশস্থলের আশপাশসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশ, র্যাব, আনসার ও এপিবিএন সদস্যরা। রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তায় কাজ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ৩২ হাজার সদস্য। সমাবেশস্থল গোলাপবাগ মাঠ, কমলাপুর রেলস্টেশন, মতিঝিল, নয়াপল্টন, কাকরাইল, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা কড়া নিরাপত্তার বলয়ে রাখা হয়।
তল্লাশিচৌকিতে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তারা তল্লাশি করছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে যেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে তা খেয়াল রাখা হয়। সমাবেশের নামে নাশকতা যাতে না হয়, সে জন্য নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবও ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ভ্রাম্যমাণ চেকপোস্ট বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করে। মতিঝিল, শাপলা চত্বর, ফকিরাপুল, সচিবালয় এবং জিরো পয়েন্টসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় র্যাবের চেকপোস্ট বসানো হয়।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সমাবেশ সামনে রেখে বিভিন্নস্থানে নিরাপত্তাচৌকি বসানো হয়েছে। দেশের নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার, র্যাব সবকিছুই করছে।’
গতকাল সকালে বিজয়নগর এলাকায় আসেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাসিন্দা শরফরাজ। ব্যারিকেড উপেক্ষা করে নয়াপল্টন যেতে চাইলে তাকে আটকে তার মোবাইল ফোন ঘেঁটে দেখেন পুলিশ সদস্যরা। মোবাইল ফোনে দেখা যায়, বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করেছেন শরফরাজ। একপর্যায়ে স্বীকার করেন তিনি বিএনপির রাজনীতি করেন। পার্টি অফিস দেখতে এসেছেন। পরে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় শরফরাজ বলতে থাকেন, ‘আমি এই দেশের নাগরিক। কোনো অন্যায় করিনি।’
তল্লাশির নামে হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ সহায়তা করেছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুলিশি টহল ছিল। নাশকতা রোধ করতে পুলিশ নানাভাবে কাজ করেছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অপরাধীরা তথ্য আদান-প্রদান করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। আর এ কারণে সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনে কী তথ্য আছে, তা দেখা হচ্ছে। তবে মোবাইল ফোন দেখার নামে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।’
গতকাল রাজধানীর ৫০টি থানার পুলিশ সদস্যরাও পাড়া-মহল্লায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করে। তারা বেশি তৎপর ছিল পথচারীদের মোবাইল ফোন সেট ঘেঁটে দেখাতে। এ নিয়ে অনেক জায়গায় পুলিশের সঙ্গে পথচারীদের বাগ্্বিতণ্ডাও হতে দেখা গেছে। মোবাইল ফোনের ব্যক্তিগত তথ্য ঘেঁটে দেখাতে পথচারীরা হন ত্যক্তবিরক্ত।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘অপরাধীদের ধরতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। বিএনপির সমাবেশ সামনে রেখে কোনো ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে না। তল্লাশির সময় মোবাইল ফোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে নিরাপত্তার স্বার্থেই। পুলিশের কোনো সদস্য কাউকে অহেতুক হয়রানি করলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গাজীপুরে ঢাকায় ঢুকতে বাধা : ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালায়। পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষ ঢাকার দিকে কেউ যেতে পারেনি। গতকাল উত্তরাঞ্চল থেকে কোনো যাত্রীবাহী বাস ও ব্যক্তিগত যানবাহনও ঢাকার দিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া টঙ্গী রেলজংশন ও জয়দেবপুর রেলজংশনে ঢাকাগামী যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। টঙ্গী ও জয়দেবপুর স্টেশনে প্রতিটি ট্রেনকে তিন-চার ঘণ্টা করে থামিয়ে রাখতে দেখা গেছে। পরে ট্রেন ছাড়লেও ট্রেনগুলো মূলত ফাঁকা অবস্থায় ঢাকা গেছে।
রূপগঞ্জে গণপরিবহন চলাচল বন্ধে ভোগান্তি : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে কড়া তল্লাশি চালায়। ঢাকাসহ অন্যান্য জেলা-উপজেলায় যাওয়ার সব গণপরিবহনও বন্ধ ছিল। এতে ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ যাত্রীরা।
সাভারে ফাঁকা সড়কে পথে পথে তল্লাশি : ঢাকার সাভারে সড়ক-মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে সড়কে গণপরিবহনের উপস্থিতি কম দেখা গেছে। পুলিশি ঝামেলার আশঙ্কায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে দূরপাল্লার কোনো গণপরিবহনের দেখা মেলেনি।
সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে যান বন্ধ : ঢাকার প্রবেশদ্বার মানিকগঞ্জের সিংগাইরে প্রায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন অসুস্থ রোগীসহ সাধারণ যাত্রীরা। চেকপোস্টে কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ।
কেরানীগঞ্জে অঘোষিত হরতাল : ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক প্রকার অঘোষিত হরতাল পালিত হয়েছে। সকাল থেকে যান চলাচল এক প্রকার বন্ধ ছিল। কেরানীগঞ্জ থেকে রাজধানীর প্রবেশমুখে ছিল পুলিশের কড়াকড়ি চেকপোস্ট। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গা নদীতে সকাল থেকে নৌকা বা অন্য কোনো নৌ-যান চলাচল করতে দেখা যায়নি। বাবুবাজার সেতু, পোস্তগোলা সেতু ও বসিলা ব্রিজে ছিল পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি। রাজধানী থেকে কেরানীগঞ্জে প্রবেশে কোনো বাধার মুখে না পড়তে হলেও, রাজধানীতে প্রবেশে প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছে।
যাত্রীর সংকটে ঢাকা ছেড়ে যায়নি বেশির ভাগ লঞ্চ : গতকাল নগরীর একমাত্র লঞ্চ টার্মিনাল সদরঘাটে সারি সারি লঞ্চ দাঁড় করানো ছিল। যাত্রীর সংকটে ঢাকা ছেড়ে যায়নি বেশির ভাগ লঞ্চ। আবার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা লঞ্চের সংখ্যাও ছিল খুব কম। দু-একজন যাত্রী এলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যেতে হয়েছে তাদের। সংঘাতের শঙ্কায় বন্ধ ছিল সদরঘাটমুখী সব ধরনের গণপরিবহন। বুড়িগঙ্গা নদীতে খেয়া নৌকা পারাপার বন্ধ থাকায় বাবুবাজার সেতু দিয়ে চলাচল করতে হয় যাত্রীদের।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ প্রতিনিধি।
