কে বলল ম্যারাডোনা নেই! আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর আছেন সবখানে। শুক্রবার রাতে তাকে সঙ্গী করে সেমিফাইনালে পা রেখেছে আর্জেন্টিনা। পাগলাটে রাতে যেন ম্যারাডোনা ভর করেছিল মেসির মধ্যে। নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই মেসি যেন ‘মেসিডোনা’। ডাচ কোচ লুই ফন গালের দিকে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে, প্রতিপক্ষ কোচ-খেলোয়াড়দের সঙ্গে তর্কে জড়ানো, রেফারির সমালোচনামুখর হওয়া এ সব কিছুই যেন ম্যারাডোনার কাছ থেকে নেওয়া। লুসাইলে শুক্রবার রাতে এসব কিছু করেই ম্যারাডোনাকেই ফিরিয়ে এনেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। ভুল বলা হলো। ফিরিয়ে তো আনেননি। দু’বছর আগে অনন্তলোকে পাড়ি দেওয়া ম্যারাডোনা তো মেসিদের সঙ্গেই আছেন! দূর আকাশ থেকেই হয়তো উত্তরসূরির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ভেবো না, আমি আছি। তোমরা এগিয়ে যাও।’
‘স্বর্গ থেকে ডিয়েগো আমাদের দেখছেন। সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন প্রতিটা মুহূর্ত এবং বিশ্বাস করি এই সমর্থনটা শেষ পর্যন্ত পাব’ নানা ঘটনার জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি কথা দিয়েও ৮৬’র বিশ্বকাপ জয়ের নায়কের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিলেন মেসি। তার জাদুতে আর্জেন্টিনা একটা সময় ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে বদলি স্ট্রাইকার ওউট ওয়েগহর্স্টের জোড়া গোলে ডাচরা প্রাণ ফিরে পায়। ম্যাচটা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। মেসি ম্যাজিক চলছিল সে সময়েও। তাকে দেখে বিস্ফোরিত হয়েছিলেন সতীর্থরাও। তবে ভাগ্য সহায় ছিল না বলেই আর গোল হয়নি। নিয়তি অবশ্য ঠিকই সঙ্গী হয়েছে তাদের। টাইব্রেকারে গোলকিপার এমি মার্তিনেজের কৃতিত্বে শেষ চার নিশ্চিত হয়। লাউতারো মার্তিনেজের লক্ষ্যভেদের পর শুরু হয় মেসিদের বুনো উল্লাস, ‘যখন লাউতারোর গোলে আমাদের এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত হয়, তখন আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। সত্যিই মনে হচ্ছিল হাজার মনের একটা পাথর বুক থেকে নেমে গেছে। ম্যাচটা শুরু থেকেই খুব কঠিন ছিল। তবে জানতাম এরকম কিছুই হবে।’ মেসিদের খেলাটা কঠিন করে তুলেছিল লুই ফন গালের দুর্দান্ত এক চালে। মেম্ফিস ডিপেকে বসিয়ে ওয়েগহর্স্টকে নামান তিনি। ৭৮ মিনিটে মাঠে নামার ৫ মিনিটের মধ্যে প্রথম গোল করে ডাচদের ম্যাচে ফেরান দীর্ঘদেহী ফরোয়ার্ড। ১০ মিনিট ইনজুরি টাইমের শেষ দিকে গোল করেন আবার। মেসিও স্বীকার করে নিলেন তা, ‘লং বলে ডাচরা চেয়েছে আমাদের কাজটা কঠিন করতে। তাতে তারা সফলও হয়েছে। আমরা খুব ভুগেছি। তবে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছি, এটাই বড় কথা।’ মেসির কথায় ঝরেছে সমর্থকদের প্রতি অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা, ‘মানুষের ভালোবাসা নিয়েই আমরা মাঠ ছেড়েছি। তাদের সঙ্গে প্রতিটা মুহূর্ত ছিল উপভোগ্য। আর্জেন্টিনার মতো এখানেও মানুষের মধ্যে দেখেছি বাঁধভাঙা উল্লাস। তারাই আমাদের অনেক বড় অনুপ্রেরণা।’
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির কাছে এই ম্যাচটা ছিল পাহাড়সম চাপের। প্রতিপক্ষের ডাগআউটে ফন গালের মতো অভিজ্ঞ কোচ। বয়সে, অভিজ্ঞতায় স্কালোনির চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। তাই আর্জেন্টাইন বসকেও হতে হয়েছে অনেক বেশি কৌশলী। যদিও শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান কোচের গাণিতিক কৌশলের কাছে একটা সময় হার মানতে হয়েছিল। বিশেষ করে ১০ মিনিট যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে ডাচদের অভিনব ফ্রি-কিকটা হয়তো ভাবনাতেই আসেনি স্কালোনির, ‘এটা সত্য যে আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে ম্যাচটা টাইব্রেকারে যাওয়া অন্যায্য ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা লড়াই করে জিতেছি। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধটা ছিল বিস্ময়কর! সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তারপরও যেটা হয়েছে, সেটাই আসলে ফুটবল। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর অবাক হয়ে ভেবেছি, কি রোমাঞ্চকর একটা ম্যাচ ছিল এটা! অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, ঐতিহ্য মিলিয়ে সর্বজয়ী হয়ে ওঠার সামর্থ্য আমাদের আছে।’
এমন জয়ের পর আবেগকে দূরে ঠেলে রাখতে পারেননি ভীষণ বাস্তববাদী স্কালোনি। ডাগআউটে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে আবেগতাড়িত হতে দেখা গেছে। তবে সেই আবেগ এক পাশে রেখে এখনই স্কালোনিকে সাজাতে হচ্ছে ক্রোয়াটদের হারানোর কৌশল। সময় বড্ড কম। মাত্র দুদিন। এই সময়েই মেসিদের তৈরি করতে হবে সেমিফাইনালের মহা-লড়াইয়ের জন্য। আর এখানেই স্কালোনির মনে ঠাঁই নিয়েছে দুশ্চিন্তা। স্প্যানিশ রেফারি অ্যান্তনিও মাতেওর কীর্তিতে সেমিফাইনাল মিস করতে চলেছেন দুই ডিফেন্ডার মার্কোস আকুনা ও গনজালো মনতিয়েল। এই রেফারি শুক্রবার লাল-হলুদ মিলিয়ে দুদলকে মোট ১৬টি কার্ড দেখিয়েছেন। যার ৯টি আর্জেন্টাইনদের। যে তালিকায় আছেন মেসিও। আকুনা ও মনতিয়েল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়পর্বের ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখায় সেমিফাইনাল খেলতে পারবেন না। তবে দারুণ প্রত্যয়ী আর্জেন্টাইন কোচ শুরু থেকেই একটা কথা বলে আসছেন, ‘ফুটবলে যে কোনো সময় যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। সেটা মেনেই আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে।’
স্কালোনির এই এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র বুকে ধারণ করে আর্জেন্টিনা আরেকটা মহা-লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রাজিলকে বিদায় করা গতবারের ফাইনালিস্টদের দেশে ফেরার পথ দেখানোর অনুপ্রেরণাটা তো সেই পাগলাটে রাত থেকেই অর্জন করেছে মেসি অ্যান্ড কোং। আর স্বর্গ থেকে তো ম্যারাডোনা আছেনই!
