মনে হতো দরজা খুলে দিলেই বিপ্লব ঘরে ঢুকে পড়বে

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:০৩ পিএম

আমাদের সমবয়সী বা কাছাকাছি বয়সের অনেকের সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, আগে সব ঠিক ছিল। এখন কোথাও কিছু আলো নেই। সব অন্ধকার। অনেক সময় ঠাট্টা করে আমরা বলি, সবকিছু ‘ব্যাদে’ অর্থাৎ ‘বেদ’-এ আছে। এই ঠাট্টার লক্ষ্য মনুবাদী, মৌলবাদী ধ্যান-ধারণা। যুক্তিতর্কের বাইরে নিছক আবেগ দিয়ে সব বিশ্লেষণ করা। ইদানীং এই প্রবণতা বাড়ছে। এ একধরনের গোঁড়ামি। কিন্তু এই একই মৌলবাদ তথাকথিত প্রগতিশীল বন্ধুদের মধ্যেও দেখলে বেশ অবাক লাগে। বিশেষ করে এ ধরনের চিন্তাভাবনা বেশি দেখা যায় ষাট-সত্তর দশকের প্রজন্মের মধ্যে। এটা ঠিক, সে সময় সারা দুনিয়ায় বাম মতাদর্শ অনেক সক্রিয় ছিল। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-সাহিত্যে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃপ্তি মিত্র, কেয়া চক্রবর্তী, বাদল সরকার নাটকে; উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষরা চলচ্চিত্রে রাজত্ব করছেন। পরিচালনায় সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক; গানে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, কিশোর কুমার আরও অনেকে স্বমহিমায় রাজত্ব করছেন। বামপন্থি রাজনীতি আদর্শের পথে এগিয়ে চলেছে। এক এক সময় তো মনে হচ্ছে, বিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে। দরজা খুলে দিলেই বিপ্লব হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়বে।

বাস্তবে তা ঘটল না। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতন ঘটার পর থেকেই গেল গেল রব উঠল বিভিন্ন দেশের বামপন্থিদের একাংশের মধ্যে। তারও পরে গোলকায়নের ধাক্কায় অনেকেই হিমশিম খেয়ে, সহজ রাস্তা, মনের সুখে পুরনো স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরলেন। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম...’। আমি এই অতীত বিলাসীদের থেকে হাজার হাত দূরে।

আদরের ছোট পুত্র শমীর মৃত্যুর খবর যখন এলো রবীন্দ্রনাথ তখন ট্রেনে কলকাতা ফিরছেন। নীরব কবি বিষাদ বুকে নিয়ে চরাচরের দিকে তাকালেন। বাইরের পৃথিবী বড় চমৎকার। ছোট ছোট নদীর জলে মায়াবী চাঁদের আলো বড় সুন্দর। অজানা কোনো পাখি একমনে ডেকে চলেছে। কবি বুঝলেন, পৃথিবীতে ব্যক্তিশোক যতই যন্ত্রণার হোক, বিপুলা পৃথিবী তার মতো করে এগিয়ে চলে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। রবিঠাকুর লিখলেন, ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে...’।

মাও সেতুং বলতেন, ‘যা কিছু পুরনো তাই ঐতিহ্য নয়।’ সত্যিই কি আগে সব ভালো ছিল! কালোবাজারি ছিল না, দুর্নীতি! কিংবা অসততা! এসব কি ছিল না? এক-আধজন নিশ্চয়ই বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম বা প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত বা পরের যুগে মৃত্যু-তুচ্ছ-জ্ঞান করা স্বাধীনতা যোদ্ধা থাকলেও ব্রিটিশদের পা ধরে রায়বাহাদুর, খানবাহাদুররা তো সংখ্যায় কম ছিলেন না। কলকাতা শহরের যত ঐতিহাসিক স্থাপত্য, বসত, ঠাকুর দালান অধিকাংশই গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশদের মুৎসুদ্দি পুঁজির দৌলতে। বামপন্থি রাজনীতিতে আদর্শবাদ একসময় নিশ্চিত আজকের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু তখনো সবাই লেনিন ছিলেন এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই। অনেক আগুনখেকো বিপ্লবীর আসল চেহারা শুনলে চমকে যেতে হবে। আমার বাবা বলতেন, জেলে গেলে বোঝা যায় কমরেডদের আসল চেহারা। সামান্য মাছের টুকরো নিয়ে যেভাবে কেউ কেউ কামড়া-কামড়ি করেন, দেখে কে বলবে এরাই সাম্যবাদী সমাজের রূপকার!    

জীবন আসলে নদীর মতো। কখনো একদিক শুকিয়ে যায়। চড়া পড়ে। ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। কিন্তু অন্য দিকে স্রোতে ভেসে যায়। চড়াতে নতুন বসতির পত্তন হয়। গড়ে ওঠে নতুন স্বপ্ন। এভাবেই সভ্যতা বয়ে চলে নিরন্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দী। হাজার বছর ধরে চেষ্টা করতে করতে মানুষ একদিন পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। আজ সে প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাঁদে অবধি পৌঁছে গেছে।

কয়েক দশক আগেও হিন্দু ঘরে বাবাকে সন্তান আপনি সম্বোধন করত। আজ অনেক সংসারেই বাবা-মা দুজনেই সন্তানের বন্ধু হয়ে গেছেন। একদা যে দূরত্ব ছিল তা আজ আর নেই। স্নেহ তখনো ছিল। এখনো আছে। তার প্রকাশভঙ্গি পাল্টে গেছে। একটা সময় ছিল যখন কুন্দনলাল সায়গল, কানন দেবী বা কৃষ্ণ চন্দ্র দের গান লোকের মুখে মুখে ফিরত। এখন তারা নতুন প্রজন্মের কাছে বাতিল হয়ে গেছেন। নতুন কত শিল্পী উঠে আসছেন রোজ। আমরা খোঁজও রাখি না। কোক স্টুডিওতে ভালোমন্দ কত গান শুনি। অনেকেই তরুণ। অনেকের নামও আগে শুনিনি। কিন্তু রাতে একা শুনলে বেশ লাগে।

নিজেও মাঝেমধ্যে বলি বটে, লেখা আর আগের মতো নেই। সত্যি কি তাই! এই পশ্চিমবঙ্গেই মুখে মুখে দশজনের নাম বলে দিতে পারি যারা তথাকথিত অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। করপোরেট পুঁজি আগ্রাসী চেহারা নিয়ে সমাজের মূল্যবোধ বদলে দিচ্ছে। তার ভেতরেও কত মানুষ কত কত কাজ করে চলেছেন তা আমরা দেখেও দেখি না। যে গায়ক আদ্যোপান্ত সুবিধাবাদী, সেও মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডাক্তারদের পেশা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাততালি কুড়োচ্ছেন। কভিডকালে কত ডাক্তার জীবন তুচ্ছ করে রোগী দেখতে দেখতে মারা গেছেন এটাও সত্যি। আগে মাস্টারমশাইরা কত ভালো ছিলেন। এখন সবাই খারাপ? নিশ্চয়ই অনেক ফাঁকিবাজ, অসৎ লোক শিক্ষা জগতে আছেন। পাশাপাশি কোনো দিন টিউশনি না করে অবসর সময়ে বিনা পয়সায় ছেলেমেয়েদের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছেন এ-রকম উদাহরণও কম নেই। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কত নতুন নতুন পেশায় প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, যা আগে আমরা কখনো ভাবিনি। বিজ্ঞাপন, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ফ্যাশন ডিজাইনার, আইটি, ব্যবস্থা আরও কত। সবাইকে স্রেফ ভোগবাদী, স্বার্থপর বলতে আমি অন্তত রাজি না। করোনা সংকটের মধ্যে রেড ভলেন্টিয়ার্সের ভূমিকা ইতিহাস মনে রাখবে। এই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাই আজও গণআন্দোলনের সামনে থাকে। সারা দেশে। এন.আর.সি’র সময় শাহীনবাগের লড়াই ভোলার নয়। এখনো উমর খালিদের মতো ছেলে জেলে থাকে, আমরা যারা ‘ধুর কোথাও কিছু নেই’ বলে হতাশা জনমনে চারিয়ে দিতে সক্রিয়, তারা শুধুই সমালোচনা করি।

গ্রামের পর গ্রামে ঘুরি। স্কুলে যাই। কলেজেও। অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা হয়। পাশাপাশি কত ঝকঝকে মুখ দেখি। সোজা হয়ে হাঁটছে। মাটির সঙ্গে যোগ না থাকলে ওই গেল গেল করা ছাড়া রাস্তা নেই। নিন্দুকেরা শুধুই অন্ধকার দেখেন। আমি আলোর খোঁজ করি। প্রাণ বিপন্ন করে মানুষের পাশে থাকা তরুণের মুখের দিকে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। গজদন্ত মিনারে বসে ঠিক সুরে রবীন্দ্র সংগীত শুনে তারিফ নিশ্চয়ই করব। কিন্তু গিটার হাতে নিয়ে ঈষৎ বেসুরে যে মেয়েটি জীবনের গান গাইছে, আমি আস্তে করে তার পিঠে হাত রাখব। জীবন কখনো থেমে থাকে না। তাকে হারিয়ে দেওয়া কঠিন, বড্ড কঠিন।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত