রাজধানীর পল্টন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনার মামলায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ দলটির ২২৪ নেতাকর্মীর জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিন এ আদেশ দেন।
এদিকে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে হামলার তথ্য সংগ্রহ করছে বিএনপি। তারা তা জাতির সামনে প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরবে।
গত রবিবার বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা নতুন করে জামিনের আবেদন করলে গতকাল শুনানির জন্য রাখা হয়। অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় আপাতত তারা মুক্তি পাচ্ছেন না। মহানগর হাকিম আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে দায়রা আদালতে আপিল করা যায়। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আলোচনা করে দায়রা আদালতে জামিনের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
জামিনের পক্ষে ও জামিনের বিরোধিতায় দুপক্ষের অন্তত দুই শতাধিক আইনজীবীর শুনানিকালে আদালতে ছিলেন। জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরেও বিএনপি ও সরকারপন্থি অসংখ্য আইনজীবী অবস্থান নেন।
আদালতে বিএনপি নেতাকর্মীদের পক্ষে অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন মেজবা শুনানি করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু। তার সঙ্গে ছিলেন ঢাকা জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়ত হোসেন, বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজাদ রহমানসহ রাষ্ট্রপক্ষের অর্ধশত আইন কর্মকর্তা। জামিন নামঞ্জুরের আদেশের পর বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতে সেøাগান দেন।
৮ ডিসেম্বর রাতে মির্জা ফখরুল ও মির্জা আব্বাসকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। নয়াপল্টনের সংঘর্ষের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন আদালত জামিন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠায়। জামিন নামঞ্জুরের সাত দিনের মধ্যে ফের জামিন চাইতে হলে বিশেষ আবেদন (স্পেশাল পুট-আপ) করতে হয়।
কার্যালয়ে হামলার চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরবে বিএনপি : নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের টিয়ার শেল ও সাউন্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ করে নেতাকর্মীদের হত্যা, অতর্কিতে কার্যালয়ে অভিযানের নামে তা-ব, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফাইলপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রসহ নগদ টাকা লুটের ঘটনার সারসংক্ষেপ তৈরি করে জাতির সামনে উপস্থাপন করবে দলটি। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং ভিডিও সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হবে। গতকাল দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেন বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। তারা বলেন, আমরা নিজেরাও কার্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করছি। সবশেষে সার্বিক বিষয় দেশ, জাতির সামনে তুলে ধরব। এ ছাড়া গতকাল গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা নয়াপল্টনে ক্ষতিগ্রস্ত কার্যালয় পরিদর্শন করেন।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ বেপরোয়াভাবে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে নেতাকর্মীদের ওপর। এতে বিএনপির শতাধিক নেতা গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চিকিৎসার জন্য নিতে বাধা দিয়েছিল পুলিশ। যথাসময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় মারা যান স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মকবুল আহমেদ। এরপর কার্যালয়ে বোমা আছে দাবি করে কার্যালয়ে নিজেরাই বোমা নিয়ে ঢোকে। কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অফিস, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অফিস কক্ষে তা-ব চালায় পুলিশ। ঘটনার পর আমরা দুটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আহতদের হাসপাতালে নিতে চাইলে পুলিশ সুযোগ দেয়নি। সেদিন আহতদের যথাসময়ে চিকিৎসা করা গেলে মকবুল হয়তো বেঁচে যেত।’
কার্যালয় খোলার পর প্রথমবারের মতো গতকাল দুপুরে নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা পুরো কার্যালয় ঘুরে দেখেন এবং পরে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে তা-ব চালিয়েছে, তার নগ্ন চিত্র দেখলাম। এটা বাংলাদেশে নজিরবিহীন। পৃথিবীতে সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের অফিস ভাঙচুরের এমন নজির নেই। এ ধরনের ঘটনা মহান মুক্তিযুদ্ধেও হয়নি। কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের অফিসের দরজা ভেঙে ভেতরে সবকিছু তছনছ করা হয়েছে। হিসাব শাখা লুটপাট করা হয়েছে।’
এ সময় খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘আমাদের ঘোষিত ১০ দফা দাবি সমর্থন করে যারা যুগপৎ আন্দোলন করবে তারাও একই কর্মসূচি দিয়েছে। নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে আগামীকাল (আজ) মঙ্গলবার নয়াপল্টন অফিসের সামনে থেকে গণমিছিল করব আমরা।’
কারাবন্দি নেতাদের বাসায় জ্যেষ্ঠ নেতারা : গতকাল দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালামের বাসায় গিয়ে সান্ত¡না দিয়েছেন। রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় বাসায় ঢুকে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা ওয়ারী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল মাহবুব মিজুর বাবা মিল্লাত মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল মিজুদের বাসায় গিয়ে তাদের সান্তনা দেন।’
মকবুলের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা বিএনপির : নয়াপল্টনে সংঘর্ষে নিহত মকবুলের স্ত্রী মেরিনা আক্তার বর্ষা এবং ছোট মেয়ে মিথুরা আক্তার মারিয়া গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে আসেন। এ সময় তাদের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোলকিপার ও ঢাকা উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক এর আগে মকবুলের পরিবারকে ১ লাখ টাকা অনুদান দেন। পাশাপাশি তার মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও নিয়েছেন।
