সার, ডিজেল ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কথা মোটেও বিবেচনা না করে সরকার এবার আমন ধানের দাম গত বছরের চেয়ে প্রতি কেজিতে মাত্র ১ টাকা বৃদ্ধি করে ২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। সে হিসাবে প্রতিমণ (৪০ কেজি) ধানের দাম হলো ১ হাজার ১২০ টাকা। অথচ দেশের বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে প্রতিমণ আমন ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, যা সরকারি দামের চেয়ে ১৮০ থেকে ২৮০ টাকা বেশি। এটা অন্নদাতা কৃষকের সঙ্গে প্রহসন ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয় বলে আমরা মনে করি। বাংলাদেশে কৃষক ছাড়া সবারই সংগঠন আছে। আন্দোলন করে তারা তাদের দাবি আদায় করে নেন। ব্যবসায়ীরা জনগণের কষ্টের কথা তোয়াক্কা না করে নানা অসিলায় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। কারণ, তাদের সংগঠন আছে। আছে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের অসীম ক্ষমতা ও অর্থের দাপট। বাস মালিকরা তাদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি করেন। কারণ, স্বার্থের সেতুবন্ধনে তারাও দলমত নির্বশেষে সবাই সংগঠিত। কিন্তু সরকার কিংবা কোনো পক্ষই কৃষকের স্বার্থ দেখছে না।
এটা ভুলে যাওয়া ঠিক না যে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় আমন ধানের গুরুত্ব অপরিসীম। উৎপাদিত ধানের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ আসে আমন থেকে। আমনের উৎপাদন খরচও কম। তেমন সেচের প্রয়োজন হয় না। খরার সময় একটি সম্পূরক সেচ দিলেই পাওয়া যায় কাক্সিক্ষত ফলন। কিছু নামলা জাত ছাড়া প্রায় অধিকাংশ আমন ধানই ইতিমধ্যে কাটা গেছে। এখন মাড়াই, সেদ্ধ ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। কোনো কোনো কৃষক আমন ধান কেটে সেই জমিতে আলু, আখ, সরিষা, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, মসুরসহ নানা ধরনের রবিশস্য চাষ করছেন। কেউ করছেন শীতকালীন সবজির চাষ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল নতুন জাত ও হাইব্রিড ধানের জাত সম্প্রসারণের কারণেও এ-বছর আমনের ফলন বেড়েছে বেশ।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস বলছে, অনুকূল আবহাওয়া-তাপমাত্রা ও সূর্যালোকের কারণে আশাতীত ফলন হয়েছে আমনের। এতে ১ কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হতে পারে। গত পাঁচ বছরের আমন মৌসুমে ফলনের ওপর আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট উপাদান সূর্যালোক, সূর্যকিরণ ঘণ্টা, তাপমাত্রা, মেঘমুক্ত আকাশ ও আপেক্ষিক আর্দ্রতার প্রভাবের গাণিতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ব্রি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, এ-বছর আমনের ফলন হবে হেক্টর-প্রতি ৩ দশমিক ৭৫ টনের বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, এটাই গত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ ফলন। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে আমনের ফলন হয়েছিল হেক্টর-প্রতি ২ দশমিক ৬১ টন এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে হয়েছিল ২ দশমিক ৫৭ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট আবাদকৃত জমির ৭৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। কর্তনকৃত ৪৪ লাখ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৩৮ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। সে হিসাবে হেক্টর-প্রতি ধান ফলেছে ৩ দশমিক ১ টন। অন্যদিকে, কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে ৫৬ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এ-বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৭ হাজার ৪৪৭ হেক্টর বেশি জমিতে রোপা আমনের চাষ হয়েছে। আর রোপণকৃত জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টন। বোনা আমনে ২ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এক্ষেত্রে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে। সে হিসাবে এবার আমন মৌসুমে রোপা ও বোনা মিলে মোট আবাদ হেেয়ছে ৫৯ লাখ ২২ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে আমন মৌসুমে সরকারিভাবে তিন লাখ টন আমন ধান ও পাঁচ লাখ টন সেদ্ধ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা শুরু হবে। ধান কেনা হবে প্রতি কেজি ২৮ টাকা ও চাল কেনা হবে ৪২ টাকা দরে, গত বছর যা ছিল যথাক্রমে ২৭ ও ৪০ টাকা। কেউ কেউ বলছেন, এবার অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আমনে গত বছরের চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন চাল বেশি হবে। অবে অন্যেরা বলছেন ভিন্ন কথা। এবার বিলম্বে বৃষ্টির কারণে দেরিতে আমনের চারা রোপণ করা হয়েছে। সার ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণেও কৃষক সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করতে পারেননি। পারেননি খরার সময়ে সম্পূরক সেচ দিতে। ফলে অধিক উৎপাদন তো দূরের কথা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাটাই কঠিন হয়ে দঁড়াতে পারে।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার কয়েক দফায় ডিজেলের দাম বেড়েছে, বেড়েছে সারের দাম ফলে পরিবহন খরচসহ বিঘাপ্রতি খরচ বেড়েছে গত বছরের চেয়ে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ধান হয় ১২ থেকে ১৫ মন। সে হিসেবেও প্রতি কেজি ধানের মূল্য কমপক্ষে ২.৫০ থেকে ৩.০০ টাকা বৃদ্ধি করে ৩১ টাকা নির্ধারণ করা উচিত ছিল। কিন্তু সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে দামে কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করবেন বলে মনে হয় না। কৃষকের কথা সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের দাম কমপক্ষে ৩৫ টাকা হওয়া উচিত। সরকারিভাবে ধানের দাম কম হওয়ায় বিগত কয়েক বছর ধরে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। সর্বশেষ বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান ২৭ টাকায় ও সেদ্ধ চাল ৪০ টাকায় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এ সময় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার টন। নির্ধারিত সময় শেষে বোরো ধান সংগ্রহ হয় মাত্র ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭৪ টন। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ ভাগই পূরণ হয়নি। তবে চালের ১১ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৮৮ টন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের কথা হলো, ধান ও চালের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়েই ধান-চালের সরকারি দাম নির্ধারণ করতে হবে। এ-বছর সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অন্য বছরের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি। একইসঙ্গে দেশে চলছে সর্বকালের রেকর্ড মূল্যস্ফীতি। সেসব বিচেনায় নিলে সরকার নির্ধারিত দাম কৃষকের জন্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকারকে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ দেখতে হবে। আবার সরকার দাম বাড়ালে খোলাবাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দেন এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীরা। তাই সরকারি দাম সঠিকভাবে নির্ধারণ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বৈশি^ক সংকটের কারণে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এ মুহূর্তে কৃষক যদি লোকসানের সম্মুখীন হন, তা হলে তারা চাষাবাদ থেকে সরে যেতে পারেন। আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। পেশা পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন। ধান-চালসহ যেকোনো কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণের সময়ই এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত।
লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট
