বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ পশ্চিমা দেশগুলোর আচরণকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি, ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা এবং বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো ছাড়া অন্যান্য দলের রাজনীতিকরাও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর সমালোচনা করেছেন।
এর মধ্যে গত বুধবার ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের রাজধানীর শাহীনবাগে ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি সংগঠনের কো-অর্ডিনেটরের বাসায় যাওয়া এবং সেখানে ‘মায়ের কান্না’ নামে আরেকটি সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে কথা না বলারও সমালোচনা করেছেন তারা। পরে নিরাপত্তা নিয়ে একই দিন বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেনের কাছে পিটার হাসের উদ্বেগ প্রকাশ করার বিষয়টিও সমালোচনার বাইরে যায়নি।
এদিকে ‘মায়ের কান্না’ নামে একটি সংগঠনের সদস্যদের কথা না শুনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনার সমালোচনা করেছেন দেশের ৩৪ বিশিষ্ট নাগরিক। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে পিটার হাসের এ আচরণকে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে উল্লেখ করে তারা বলেন, তাদের কাছ থেকে স্মারকলিপিটি গ্রহণ করলে, কেউ তাকে পক্ষপাতপূর্ণ আচরণের দায়ে অভিযুক্ত করতে পারতেন না। অন্যদিকে পিটার হাসের ঘটনায় বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরা বলেছেন, গত ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে ঘিরে এবং এরপর গত দু-তিন দিন পিটার হাসের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, নিজেদের রাজনীতি ও নির্বাচন ইস্যুতে বিদেশিদের যুক্ত করার বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই ভালো নয়। একইভাবে রাষ্ট্রদূতদেরও তাদের সীমার মধ্যে থাকা উচিত। দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে এতটা জড়িয়ে পড়া অবশ্যই কূটনীতির রীতির বাইরে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রদূতদের তলব করে সতর্ক করা যেতে পারে।
এ ব্যাপারে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কোনো দেশ নাক গলাতে পারে না। আর রাষ্ট্রদূতরা নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে অন্য কোনো দেশকে পরামর্শ দিতে পারেন না। কিন্তু গত কয়েকটি নির্বাচনের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচন কেমন হবে, তা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা রাষ্ট্রদূতদের গত কয়েক দিনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় সরব। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে কোনো রাষ্ট্রদূতকে তলব করতে পারে এবং আরও কঠোর হতে পারে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রণালয়ে তলব করা উচিত। তারা নিশ্চয়ই জানে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো উচিত কি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের এ বিষয়ে খুশি হওয়ার কিছু নেই। এটা একটি রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই সম্মানজনক নয়। গত দুদিন ধরে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের যে আচরণ তা কোনোভাবেই শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। এ ধরনের ঘটনায় আমরা দেখেছি অনেক দেশ ওই কূটনীতিককে দেশ থেকে প্রত্যাহারও করেছে। আমার মনে হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রদূতদের জন্য একটি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা উচিত।’
এদিকে পিটার হাসের সক্রিয়তা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রদূতের তৎপরতায় অনেকটাই বিব্রত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশের নির্বাচন, রাজনীতি এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে রাষ্ট্রদূতরা কথা বলা অব্যাহত রেখেছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্নভাবে এসবের জবাব দেওয়া হচ্ছে। গত ১১ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসসহ অন্তত ১০ দেশের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর সমালোচনা করেছেন। এরপর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পিটার হাসের শাহীনবাগের বাসায় যাওয়ার ঘটনায় এবং নিজেই তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশে বিব্রত হয়েছে সরকার।
এদিকে গতকালও এ ঘটনা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, ১৪ দলীয় জোটের নেতারা পিটার হাসের সমালোচনা করেছেন। পাশাপাশি বিদেশিদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর জন্য বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন তারা।
এদিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সমন্বয়কের বাসায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসকে বিতর্কিত করা হয়েছে বলে মনে করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘বুধবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ছিল। সেদিন সবাই শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অনেক সময় বিদেশি রাষ্ট্রদূতরাও সেখানে শ্রদ্ধা জানান। যদি মার্কিন রাষ্ট্রদূতও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যেতেন, তাহলে সেটি অনেক ভালো হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুধবার যারা মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে গেছেন, তারা তাকে বিতর্কিত করেছেন। এখানে বিতর্কিত করা সমীচীন হয়নি। তিনি সেখানে গেছেন এটি শুনে “মায়ের কান্না” সংগঠনের ৫০ জনের মতো গিয়েছিলেন। তারা গিয়েছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে স্মারকলিপি দিতে। যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, তারা সে সুযোগ দেননি। আমি মনে করি মার্কিন রাষ্ট্রদূত যদি তাদের স্মারকলিপিটা নিতেন এবং তাদের সঙ্গে দুটি কথা বলতেন; তাহলে তার যাওয়া নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে, সেটি হতো না।’
রাজনৈতিকভাবে ঔদ্ধত্যপূর্ণই নয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ : রাশেদ খান মেনন
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে (বুধবার) বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আচরণ কেবল রাজনৈতিকভাবে ঔদ্ধত্যপূর্ণই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা যে আচরণ করছেন, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারেরও লঙ্ঘন।’
