মহালগ্নে মহানায়ক

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:৪৩ এএম

আজ কাতারের স্বাধীনতা দিবস। পারস্য উপসাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মরুর দেশটির বয়স আজ বায়ান্নো হলো। কাতারিদের কাছে এই দিনটি ভীষণ গৌরবের, মুক্তির আনন্দের আর অধিকার আদায়ের। লিওনেল মেসির জন্যও কি দিনটি হবে একই রকম? বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন তিনি। দুই দশকে তার সৌরভ ছড়ানো ফুটবলে মোহিত হয়েছে গোটা বিশ্ব। আজ তার ফিরে পাওয়ার দিন।

বিশ্বকাপ শিরোপা প্রতিটি ফুটবলারের জন্য গৌরবের। মেসির জন্যও তাই। সেই ২০০৬ থেকেই চেষ্টার শুরু এবং বারবার হতাশা নিয়ে ফেরা। তাই তো আজকের দিনটি আর্জেন্টাইন মহাতারকার জন্য হতে পারে মুক্তির আনন্দের। প্রতি সপ্তাহান্তে অসামান্য ফুটবল দিয়ে যাওয়া মেসির তো একবারের জন্য হলেও বিশ্বকাপ শিরোপা হাতে নেওয়ার অধিকার আছে। এবারই যে শেষবার। এবার না হলে হবে না আর কোনোবার। সময় যে অস্তাচলে!

রোজারিও থেকে ন্যু ক্যাম্প। সেখান থেকে প্যারিস; এখন দোহা। এর মাঝে কেটে গেছে বহুকাল। মেসি আছেন একই রকম। শান্ত-সৌম্য আর বল পায়ে বিধ্বংসী। কোনো পরিবর্তন নেই। বাড়ির ধারের ছোট্ট ধুলোর মাঠে বল নিয়ে ছোট্ট মেসির বাঁ পায়ের কারুকাজে বিমোহিত হতো পাড়া-পড়শিরা। সেই ছেলেটিই ঈশ্বরিক বাঁ পায়ের জাদুতে এরপর হয়ে উঠেছেন ভুবনজয়ী জাদুকর। আজ বিশ্বমঞ্চে শেষবারের মতো জাদু দেখাতে উঠবেন। লুসাইলের মঞ্চ প্রস্তুত। বিদায়ী মঞ্চে জীবনের সেরা জাদুটাই আজ দেখাতে চাইবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। নইলে এতদিনের সব সাধনা বৃথা হয়ে যাবে। ছোঁয়া হবে না আজন্ম লালিত স্বপ্নের বিশ্বকাপ। নশ্বর এই পৃথিবীতে হয়ে উঠতে পারবেন না অবিনশ্বর।

জুন-জুলাইয়ের বিশ্বকাপ নভেম্বর-ডিসেম্বরে নিয়ে আসা আয়োজক কাতার ফাইনালের জন্য বেছে নিয়েছে আজকের স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিনটি। আয়োজনে লেটার মার্কস পাওয়া কাতারকে একটা দারুণ রাত উপহার দেওয়ার দায় মেসির। সেরা থেকে আগেই বিশ্বসেরা হয়েছেন। সর্বকালের সেরা হতে তার আর একটা অঙ্ক মেলাতে হবে। আরেকবার বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস করতে হবে ফ্রান্স নামক শক্ত প্রাচীর। সেটা হলেই ৩৬ বছরের হতাশা ভেঙে জেগে উঠবে আর্জেন্টিনা। ২০২২-এ তারা পেয়ে যাবে ১৯৮৬-র ম্যারাডোনাকে।

মেসিও তো চেয়েছেন ম্যারাডোনা হতে। মাঠের কীর্তিতে আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বরকে ছাড়িয়েছেন বহু আগে। অনেকেই হয়তো দ্বিমত করবেন। কে সেরা? এটা নির্ধারণ করে সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য দুনিয়ায় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তবে আছে কোটি জোড়া চোখ আর ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়। তাদের হৃদয় নিংড়ে দেওয়া সার্টিফিকেটে ম্যারাডোনা কিংবা পেলে নন, বিশ্বসেরা মেসি। তবে মেসি যে তাতেও তুষ্ট নন। দুই কিংবদন্তিই পেয়েছেন বিশ্বকাপের স্বাদ। যেটা না পেলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে জীবন।

আজ আবারও কি লেখা হবে কোনো হৃদয় ভাঙার গল্প? যেমনটা ২০১৪ সালে মারাকানায় লেখা হয়েছিল। সেবারও অমরত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও হয়নি। সেবার মেসির স্বপ্নের হন্তারক ছিল জার্মানি। এবার ফ্রান্স সেই রূপে আবির্ভূত হতে চাইবে। ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম অবশ্য ফাইনালে পা রেখেই বলেছিলেন এই মেসি একেবারেই আলাদা। তাই তাকে অকার্যকর করতেই তাকে নিতে হবে কৌশল।

কাল বিশ্বকাপ কভার করতে আসা ব্রাজিলের নারী সাংবাদিক ফানেলি এলিনি আজ জাতিগতভাবেই আর্জেন্টিনার বিরোধিতা করছেন। তবে কথার শেষ পর্যায়ে যেটা বললেন তা খুব সাংঘর্ষিক ঠেকল, ‘আমি ব্রাজিলিয়ান। কোনো অবস্থাতেই আর্জেন্টিনার জয় দেখতে চাই না। তবে আমি মেসির ভক্ত। তাকে বিশ্বসেরা হতে দেখতেও মন চায়।’ এলিনির মতো দ্বিধা নেই অনেকেরই। বিশ্ব ফুটবলের বেশ কজন কিংবদন্তি অপেক্ষায় আছেন মেসির হাতে শিরোপা দেখতে। যে তালিকায় আছেন পেলে, রোনালদো, রিভালদো, কাফু, জøাতান ইব্রাহিমোভিচ, রয় কেন, জেমি ক্যারেগার, অ্যান্থনিও ভ্যালেন্সিয়া, জন ওবি মিকেল, লুই এনরিকে, এমনকি মেসির কাছেই হেরে সেমি থেকে বিদায় নেওয়া ক্রোয়েশিয়া অধিনায়ক লুকা মদ্রিচও।

মদ্রিচ সেমিফাইনালে হারার পর বলেছিলেন, ‘অসাধারণ একটা বিশ্বকাপ কাটাচ্ছে মেসি। প্রতিটি ম্যাচে সেরাটাই দেখিয়ে চলছে। আশা করছি মেসি এই বিশ্বকাপটা জিতে নেবে। সে-ই ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় এবং শিরোপাটা তার প্রাপ্য।’ স্পেনের ব্যর্থ কোচ এনরিকে সাবেক শিষ্যকে নিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ শিরোপা না জিতে মেসির অবসর নেওয়াটা হবে অন্যায়। আমি চাই ও জিতুক এটা।’

১৯৭৮ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার হয়ে ফাইনালে জোড়া গোল করেছিলেন মারিও ক্যাম্পেস। তিনি মেসিকে ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ এবং আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘শনিবারের আগ পর্যন্ত মেসিকে আমি ইয়োহান ক্রুইফ অথবা ডি স্টেফানোর কাতারে রাখব। ঠিক যেন মুকুটহীন সম্রাট। বিশ্বকাপ না জিতেও তারা মহানায়ক হয়ে আছে। বিশ্বকাপ জেতা সহজ নয়। এটা এমন নয় যে একটা ক্লাবের হয়ে একটা দীর্ঘ লিগ জিতে নেওয়া। মেসি যদি বিশ্বকাপ নাও জেতে, তাতে প্রমাণ হয় না যে সে গ্রেট নয়। তার আর কিছুই প্রমাণের নেই।’ ক্যাম্পেস মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর দায়িত্বটা দিতে চান পুরো দলকে। তারাই পারে, মহানায়ককে মুকুট এনে দিতে।

ক্যাম্পেসের কথাগুলো নির্জলা সত্য। তবে মেসি নিশ্চয় চাইবেন না ক্রুইফ-স্টেফানো হতে। আজ আরেকবার বিস্ফোরিত হয়ে, সতীর্থদের জাগিয়ে দিয়ে তিনি চাইবেন ম্যারাডোনার পাশে বসতে। তাই আজ লুসাইলের রাতটা হোক মেসির গৌরবের, মুক্তির আনন্দের আর অধিকার আদায়ের রাত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত