রাজধানী ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুরে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রেললাইন ও এর পাশ থেকে কমপক্ষে ৬০টি মরদেহ উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। যাদের লাশ উদ্ধার হয়েছে তাদের কেউ অসতর্কতার কারণে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন, কেউবা আত্মহত্যা করেছেন, আবার কাউকে ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোথাও হত্যা করে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য রেললাইনের পাশে এনে লাশ ফেলে রাখার ঘটনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসতর্কতার কারণে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর অন্যতম কারণ রেললাইনের ওপর অবৈধ রেলক্রসিং এবং রেললাইন ঘেঁষে অবৈধ বাজার ও অস্থায়ী দোকান বসানো। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা জনসচেতনতা বাড়াতে তেমন কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করছে না রেলওয়ে প্রশাসন। তবে রেলওয়ে পুলিশ বলছে, জনসচেতনতা বাড়াতে তারা কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে চলাফেরায় উদাসীনতা কাজ করে।
গাজীপুর রেলওয়ে পুলিশের এসআই সহিদুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে জেলার ধীরাশ্রম থেকে শ্রীপুরের কাওরাইদ এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুর আউটার সিগন্যাল পর্যন্ত রেললাইন ও এর আশপাশ থেকে ৪৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। এ ছাড়া ধীরাশ্রম থেকে টঙ্গী পর্যন্ত এবং টঙ্গী থেকে কালীগঞ্জের আড়িখোলা পর্যন্ত রেলপথ থেকে আরও অন্তত ১৫টি লাশ উদ্ধার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার রেলওয়ে থানা-পুলিশ জানিয়েছে।
জানা গেছে, গত ১০ জানুয়ারি টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুর রেল ব্রিজসংলগ্ন এলাকা এবং আরিচপুর গাজীবাড়ি এলাকায় রেললাইনে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই নারীর মৃত্যু হয়। এর কয়েক দিন পরেই ২২ ফেব্রুয়ারি টঙ্গী পূর্ব থানার মধুমিতা রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে যাত্রীবাহী অটোরিকশার। এতে অটোরিকশাটির এক যাত্রী মারা যান। এ দুর্ঘটনায় আরও চার জন গুরুতর আহত হন। এর কিছুদিন পর ১৩ মার্চ টঙ্গীর বনমালা এলাকায় রেলগেট পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে সাবেক এক ব্যাংক কর্মকর্তা প্রাণ হারান। তার আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি পূবাইলে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান।
জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, চলতি বছরের সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে গত জুলাই পর্যন্ত) জয়দেবপুর, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈর ৩২ জনের ট্রেনে কাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে টঙ্গীর আরিচপুর বউ বাজার, মধুমতী রেলগেট, বনমালা রেলগেট ও হায়দ্রাবাদ এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টঙ্গী রেলওয়ে ফাঁড়ির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে টঙ্গীর আরিচপুর বউ বাজার, মধুমতী রেলগেট, বনমালা রেলগেট ও হায়দ্রাবাদ এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর জন্য অধিকাংশই ঘটনায় অসতর্কতাকে দায়ী করেছে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে টঙ্গীর বনমালার হায়দ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন প্রধান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকাল থেকে গভীর রাত রেললাইনের ওপর ভিড় জমায় তরুণ-তরুণীরা। অনেক সময় লাইনের ওপর হাঁটাহাঁটি ও টিকটক ভিডিও বানানোর সময় ঘটে দুর্ঘটনা। এই এলাকায় প্রায়ই রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে নজর না দেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
টঙ্গীর বনমালা ও আরিচপুরে রেললাইনের ওপর মানুষের ভিড় থাকে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত। আরিচপুরে রেললাইনের ওপর অবৈধ বাজার থাকায় সেখানে টঙ্গী ও উত্তরার মানুষ বাজার করতে আসেন। কিন্তু হুটহাট ট্রেন চলে এলে লাইন থেকে সরে দাঁড়ানোর তেমন জায়গা না থাকায় ঘটে প্রাণহানির ঘটনা।
একই চিত্র টঙ্গীর হায়দ্রাবাদ রেললাইন এলাকার। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা এই এলাকায় ভিড় করেন। তাদের কেউ কেউ রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে টিকটক ভিডিও বানাতে ব্যস্ত থাকে। এ ছাড়া প্রেমিক যুগলরা লাইনের ওপর হাত ধরে খুঁনসুটিতে মত্ত হয়। রেললাইন থেকে এক হাত দূরত্বে চটপটি ও ফুচকার বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। এ সব দোকানের কারণেও ঘটে দুর্ঘটনা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টঙ্গী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। তবুও এসব এলাকায় জনসাধারণের মধ্যে চলাফেরার ক্ষেত্রে উদাসীনতার মনোভাব কাজ করছে।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু ট্রেনে কাটা পড়ায় নয়, অনেক সময় ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে মানুষ হত্যা করা হয়ে থাকে। আবার অন্য কোথাও হত্যা করে রেললাইনে লাশ ফেলে রেখে হত্যাকাণ্ডকে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তবে এসব ঘটনার খুব একটা তদন্ত হয় না।
২০১১-১২ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত রেললাইনের পাশ থেকে অন্তত আট জনের লাশ উদ্ধার করে রেলওয়ে পুলিশ। ট্রেনের ছাদে ডাকাতির সময় হত্যার শিকার ব্যক্তিদের এসব লাশ রেললাইনের পাশে ফেলে রাখা হয়। এসব ঘটনার পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গাজীপুরের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সে সময়ে ওই সব এলাকায় আনসার সদস্য নিয়োগ করা হয়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশের ইনচার্জ এসআই সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু এবং রেললাইনের পাশ থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রেলের আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
