ডিয়েগো ম্যারাডোনার পায়ের জাদু বিশ্ব দেখেছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। সে আসরে দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। সেবার হ্যান্ড গড আর শতাব্দির সেরা গোল দুটি হয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে। ইংলিশরা কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টাইনদের কাছে হেরে বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকে। তবে দলটির স্ট্রাইকার গেরি লিনেকার ৬ গোল করে হয়েছিলেন গোল্ডেন বুট বিজয়ী। এবারের আর্জেন্টিনা দলের মাঝে ৩৬ বছর আগের সেই ছায়া দেখতে পাচ্ছেন তিনি। আর লিওনেল মেসি যে তার জীবদ্দশায় দেখা সেরা ফুটবলার।
কাতারে ফিফা প্লাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মেসির ভূয়সী প্রশংশা করেছেন। তিনি মনে করেন এবারের গোল্ডেন বুট বিজয়ী হবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তার মতে আজ রাতের ফাইনালে লুসাইলে ট্রফি উচিয়ে ধরবে আর্জেন্টিনা।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ফাইনালে যদি এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক অথবা অসাধারণ কিছু করে বসেন তবে তার একটা সুযোগ রয়েছে। নয়তো এবার গোল্ডেন বুট মেসিই জিতবে বলে আমি মনে করি।’
সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ও বৃটিশ ফুটবল বিশ্লেষক শুধু এই বলেই থেমে যাননি। তার জীবদ্দশায় দেখা সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। অথচ তিনি ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিপক্ষে মাঠে খেলেছেন। তিনি দেখেছেন জিনেদিন জিদানকে। ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও ডি লিমার খেলাও দেখেছেন। আর্জেন্টিনার ২০০২ বিশ্বকাপের স্কোয়াডটাও তার স্বচক্ষে দেখা। তবুও তাদের আর কেউ না, মেসিই তার দেখা সর্বকালের সেরা ফুটবলার।
লিনেকার অবশ্য ব্যাখ্যাও করেছেন কেন তিনি মেসিকে সেরা ফুটবলার মনে করেন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকেই কেন ফেভারিট মনে করছেন, সেটাও জানিয়েছেন লিনেকার, ‘পিএসজিতে দুর্দান্ত ফর্মে থেকেই বিশ্বকাপে খেলতে এসেছেন মেসি। কাতারে বেশকিছু শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত তিনি দেখিয়েছেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে অবিশ্বাস্য গোল, ডাচদের বিপক্ষে সহায়তা, অসিদের বিপক্ষে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ এবং সবশেষ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তার বানানো বলে জুলিয়ান আলভারেজের অসাধারণ গোল।’
তিনি যোগ করেন, ‘তবে এটা কেবল সহায়তা নয়, এটা অতি ক্ষুদ্র কিন্তু যা লোকে খুব বেশি খেয়াল করে না। কিন্তু একজন ফুটবলারকে যখন প্রতিপক্ষ দলের তিন-চারজন ঘিরে রাখে, আর তাদের বাধা ডিঙিয়ে মেসি বেরিয়ে এসে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেন, সেটা নজর কাড়ার মতো। আর এজন্যই মেসি সবার চেয়ে আলাদা।’
তিনি বলেন, আমার জীবদ্দশায় আমি পেলেকে দেখিনি। কারণ তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। আমি শুধু ম্যারাডোনাকে দেখেছি। সে তুলনা করার জন্য এমন কিছু করে গেছে যা অন্য কেউ পারে না। গোলের পরিসংখ্যানে একজন খেলোয়াড়কে আলাদা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো অবশ্যই দুর্দান্ত ফুটবলার। কিন্তু মেসিকে অন্যদের থেকে আলাদা করার কারণ হলো, তা যে ফুটবল দক্ষতা বা মাঠে প্রয়োগের যে ক্ষমতা, সেটা অন্য কারো মাঝে নেই। যা ম্যারাডোনার মাঝে আমি দেখেছি। তবে দুজনের যুগ আলাদা, ধরণ খেলার কৌশলে এসেছে পরিবর্তন। এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করার কারণেই আমার দেখা সেরা ফুটবলার মেসি।’
এবারের বিশ্বকাপে বেশ কিছু দুর্দান্ত খেলা হয়েছে বলে মনে করেন লিনেকার। ব্রাজিলের বিপক্ষে পিছিয়ে গিয়েও ক্রোয়েশিয়ার শেষ মুহূর্তে ম্যাচ জিতে নেওয়াও তার কাছে দুর্দান্ত মনে হয়েছে। টুর্নামেন্টে মরক্কোর উত্থানও দৃষ্টিনন্দন। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার লড়াইগুলো তার দৃষ্টি জুড়িয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। আর তাই তিনি মনে করেন ফর্মের তুঙ্গে থাকা আর্জেন্টিনাকে রুখে দেওয়া কঠিন। লুসাইলে আজ তাই ফ্রান্স নয়, তিনি এগিয়ে রাখছেন আর্জেন্টিনাকে।
তিনি বলেছেন, ‘চার বছর আগে শেষ ষোলোয় এ দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার লড়াইটা অন্যরকম হবে বলেই আশা করছি। শেষ মুহূর্তে মেসির একটি গোলে সুন্দর একটি ফাইনাল হবে। আর শেষ বাঁশি বাজার পর ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন মেসি। যা আর্জেন্টিনার প্রাপ্য বলে আমি মনে করি।’
