স্বাধীনতার ৫১ বছরে দেশে পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুহার ১৩৮ শতাংশ থেকে কমে ৬২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমে এসেছে। নবজাতক মৃত্যুর হার ৫৮ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে দেশে সর্বমোট প্রজনন ক্ষমতার হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। কৈশোরকালীন মাতৃত্বের হার ৩৬ থেকে কমে ২৮ শতাংশে এসেছে। জন্মনিয়ন্ত্রক ব্যবহারের হার ৭ শতাংশ থেকে বেড়েছে ৬২ শতাংশ হয়েছে। টিকাগ্রহণের হার ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৭ শতাংশ হয়েছে।
গতকাল রবিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ‘বিজয়ের ৫১ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্জন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক।
সেমিনারে জানানো হয়, বিগত ৫১ বছরে শিশুদের মানসিক সমস্যার প্রাদুর্ভাবের হার মাত্র ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে এ সমস্যার হার ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে এসেছে।
সেমিনারে বলা হয়, দেশের স্বাস্থ্য খাতে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। শিশু-মাতৃমৃত্যু রোধ, টাইফয়েড, পোলিও, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ সব সংক্রামক রোগ প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আটটি মেডিকেল কলেজ থেকে বর্তমানে ১১৩টি মেডিকেল কলেজ হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ কিন্তু এখানকার মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম। যদিও বিগত একযুগ ধরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি বহুমুখী ব্যবস্থা যেখানে সক্রিয় ভূমিকা রাখে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং দাতা সংস্থা।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সর্বমোট ছয়টি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং চারটি সেক্টর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পরের তিন দশকে কোনো জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা না হলেও, ২০০০ ও ’১১ সালে দুটি স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। বিজয়ের ৫১ বছরে তিনটি জাতীয় ওষুধনীতি এবং একটি মানসিক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তিনটি ধাপে সেবা দিয়ে থাকে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব সেন্টার ও উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স সেবা দিয়ে থাকে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার দ্বিতীয় স্তরে জেলা হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র, এবং তৃতীয় স্তরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে।’
সেমিনারে জানানো হয়, স্বাস্থ্য খাতে বিগত এক দশকে প্রযুক্তির ব্যবহার অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ ২০০৯ সাল থেকে ডিজিটালাইজডভাবে জেলা হাসপাতালের রোগ ও রোগী সম্পর্কিত সব তথ্য সংগ্রহ করছে। ২০১৪ সালে ‘ডিজিএইচএস ড্যাস বোর্ড’-এর মাধ্যমে অনলাইনে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে মোবাইলে মাধ্যমে বহুমুখী স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। তাছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘১৯৭১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫১ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতে কী উন্নতি হয়েছে, সেটি নিয়েই আজকের অনুষ্ঠান। আমরা স্বাস্থ্যসেবায় অনেক অর্জন করেছি কিন্তু দেশে বড় আকার ধারণ করছে ক্যানসার, হৃদরোগসহ অসংক্রামক রোগীগুলো। এগুলোতেই বর্তমানে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন আর ঠিকমতো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক এখন মানুষের কাছে স্বাভাবিক খাবারে পরিণত হয়েছে। এর বাইরেও গরু, মুরগিকে যে খাবার দেওয়া হচ্ছে সেগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। যে কারণে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হচ্ছে। আমরা যখন-তখন ব্যথানাশক ওষুধ খাচ্ছি। এতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। হাসপাতালগুলোতে কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগীও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ডায়াবেটিসে আক্রান্তের পরিমাণ বাড়ছে। ডায়াবেটিস প্রিভেনশনে আমাদের একটা গবেষণা শুরু হয়েছে। এটা সফল হলে আমাদের দেশের রোগীদের আর ডায়াবেটিসের জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হবে না।’ গবেষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যতদিন দায়িত্বে থাকব, গবেষণা না করলে পদোন্নতি পাওয়া যাবে না। গবেষণা পেপার না থাকলে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হওয়া যাবে না, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর থেকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর বা প্রফেসরও হওয়া যাবে না।’
কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, ‘বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। চক্ষুরোগ, হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বর্তমানে শুধু শহরের মানুষ নয়, গ্রামের মানুষও চিকিৎসাসেবার আওতায় এসেছে। স্বাস্থ্যসেবার সব খাতেই অগ্রগতি হয়েছে। যেকোনো মহামারীকে বাংলাদেশ এখন সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গত ১০ বছরে আমাদের দেশ থেকে যে পরিমাণ রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেছে, এখন সেটি অনেক কমে এসেছে। এখন বরং অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে এসে চিকিৎসা নেয়। কারণ হলো আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। গত তিন বছর করোনা মহামারীতে আমাদের চিকিৎসকরা নিজেদের উজাড় করে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষ এ সময়ে দেশে চিকিৎসা নিয়েছেন।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ হোসেন, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমদ, ইউজিসির অধ্যাপক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি প্রমুখ।
