মেসি আর ম্যারাডোনা মিলে গেল একবিন্দুতে

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:৫৭ এএম

১৯৭৮ সালে আমি ছিলাম এস্তাদিও মনুমেন্টালের বাইরে, তখন আমি নিতান্তই ১৬ বছরের এক কিশোর। ১৯৮৬ সালে নিজেই হয়ে গেলাম বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য, সোনার কাপটাকে ধরলাম আর চুমু খেলাম। আর এইবার, ২০২২ সালে এসে গ্যালারি থেকে খেলা দেখলাম, আর্জেন্টিনার জয়ে উল্লাস করলাম আর পরে আরও একবার বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখলাম। এক জীবনে আর কী চাই! আমি একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত, তিন বার বিশ্বকাপজয়ী একটা দেশের হয়ে খেলেছি এইজন্য গর্বিত। মেসিই যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার, এই নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশই নেই। সেই সঙ্গে আর্জেন্টিনা হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম এক ফুটবল পীঠস্থান, যে দেশকে সবাই সম্মান করে।

মেসির আর্জেন্টিনা গোটা ম্যাচেই দাপটের সঙ্গে খেলেছে। এমবাপ্পেকে জ্বলে উঠতে দেখা গেছে হঠাৎ হঠাৎ। তবে এই মুহূর্তে ফুটবল ম্যাচ নিয়ে আর বিশ্লেষণ করে লাভ নেই কারণ ইতিহাস বলবে, রেকর্ড বই বলবে যে ২০২২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে মনে হচ্ছিল, আমি এস্তাদিও মনুমেন্টালে বসে আছি। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মা সবাই নেমে গেল মাঠে। সবাই তখন নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে আনন্দের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি করে নিতে ব্যস্ত। গনজালো মন্তিয়েলের শটে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার দুই ঘণ্টা পরও মাঠে তাদের দেখলাম আনন্দে মগ্ন। ঘাসের ওপর শিশুরা খেলছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ স্মারক সংগ্রহ করছে।

এই জয়ে, লিওনেল মেসি আর ডিয়েগো ম্যারাডোনা মিলে গেল একবিন্দুতে। মেসি এইবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, বিশ্বকাপজয়ী। ম্যারাডোনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জিতেছিল আর ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরেছিল পশ্চিম জার্মানির কাছে। মেসিরও এটা দ্বিতীয় ফাইনাল ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে হারের পর এবার বিশ্বকাপ জয়। তার ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু এই একটা কমতিই ছিল যেটা পূরণ হয়ে গেল।

ইতিহাসের সর্বকালের সেরা হয়ে গেছে মেসি। এরপর আমরা অন্য যে কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করতে পারি। ম্যারাডোনা কী দিয়েছে, ম্যারাডোনা কী পারত এসব প্রসঙ্গে ম্যারাডোনার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রেখেই বলছি, মেসি সর্বশ্রেষ্ঠ।

মেসির বিশ্বকাপ জয়টা ছিল আর্জেন্টাইনদের জন্য একটা বড় স্বস্তি। মাঠের ভেতর সবাই কাঁদছে, গান গাইছে, গলা জড়াজড়ি করছে... ফুটবল মাঠে এমন দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। অবিশ্বাস্য, অসাধারণ। কী যে একটা ম্যাচ হয়েছে! একবার মনে হয়েছিল, আমরা অতি সহজে জিতব। একবার মনে হলো আমরা হেরে যেতে পারি। অতিরিক্ত সময়ে আমরা জিততে পারতাম, হারতেও পারতাম। অবশেষে টাইব্রেকারে গিয়ে জিতলাম। শ্বাসরুদ্ধকর, আনন্দময়, হৃদয় জয় করা ফুটবল।

দলটা আরও একবার দেখিয়েছে, তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। দেখিয়েছে তাদের শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার সামর্থ্য। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই আজ আমরা বিশ্বকাপ জিততে পেরেছি। এই গুণটা সত্যিই বিশেষ কিছু, আমাদের জাতীয় দলটা আসলেই বিশ্বকাপ জেতার যোগ্য। দলটাকে যারা তৈরি করেছে, যারা পাশে থেকেছে সবাই প্রশংসার দাবিদার। আমরা আর ফুটবলপ্রেমীরা অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছি। এই কাপটা আমাদের প্রাপ্য। একই সঙ্গে এই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার লিওনেল মেসি, এই নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই।

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কারণ তারা প্রথম ম্যাচে হারের ক্ষত থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। এবং মেক্সিকোর সঙ্গে ম্যাচটা বাদ দিলে গোটা আসরেই ভালো খেলেছে এবং প্রতি ম্যাচেই আগের ম্যাচের চেয়ে উন্নতি করেছে। আমার মনে হয় এটাই সেরা দল। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে প্রথম ম্যাচে হেরে একটা বড় ধাক্কা খেয়েছে ওরা, সেটাই তাদের ভেতরকার ফুটবলটা বের করে এনেছে। প্রতিটা খেলোয়াড়ই ধীরে ধীরে তাদের সেরাটা বের করে এনেছে, তাদের সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটা দেখিয়েছে যেটা শুরুতে অনেক কম মনে হচ্ছিল। দলটা উন্নতি করেছে, সবগুলো বাধা অতিক্রম করেছে আর অনেক বছর পর আমাদের গর্বিত করেছে।

অবশেষে ২ কোটি আর্জেন্টাইনের জীবনে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অনেকেই তাদের দাদা দাদিদের কাছে ১৯৭৮ এর বিশ্বকাপ জয়ের গল্প শুনেছে, বাবা-মায়ের কাছে ১৯৮৬’র বিশ্বকাপ জয়ের গল্প শুনেছে যা আমার কাছে খুবই স্মরণীয়; এবার বর্তমান প্রজন্মও দেখল আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সির তিনটা তারা যেন এক সুতোয় বাঁধল তিনটা প্রজন্মকে। সমর্থকরা যে উপলক্ষটার জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন, অবশেষে সেই উপলক্ষটা এলো।

আর্জেন্টিনা দলটা অতীত গৌরবের ওপর বাঁচতে বাঁচতে একটা সময়ে মরেই যাচ্ছিল, এই বিশ্বকাপ জয় আবার তাদের বাঁচিয়ে দিল। মেসির দারুণ এক অর্জন। ম্যারাডোনার খেলা ছাড়ার পর আর আমাদের অবসরের পর মেসিকে কেন্দ্র করে দারুণ একটা দল বানাতে ৭ থেকে ৮ বছর লেগেছে। মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনার কী হয় সেটা ঠিক করতে হবে এক্ষুনি কারণ পরের কয়েকটা বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত